প্রকাশ :: ... | ... | ...

ভারতের প্রশংসা ব্রাজ়িল কোচের, দেখছেন না গুরপ্রীতের দোষ


সংযুক্ত ছবি

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল ব্রাজিলের বিপক্ষে লড়াইটা খারাপ করেনি ভারত। র‌্যাঙ্কিং ও সামর্থ্যের বিশাল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নিজেদের মাঠে রক্ষণ সামলে পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছে খালিদ জামিলের দল। কিন্তু গোলরক্ষক গুরপ্রীত সিং সান্ধুর দুটি বড় ভুল প্রথমার্ধেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। শেষ পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি দর্শকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ভারত হেরেছে ৪-০ গোলে। স্কোরলাইন যতটা একপেশে মনে হচ্ছে, ম্যাচের পুরো চিত্র ততটা নয়। প্রথমার্ধে ব্রাজিলের দুই গোলই এসেছে গুরপ্রীতের ভুল থেকে। দ্বিতীয়ার্ধে ভারত বেশ কয়েকবার আক্রমণে উঠে সুযোগও তৈরি করেছে। বিশেষ করে রায়ান উইলিয়ামস ও মনবীর সিংয়ের নেতৃত্বে ভারতের পাল্টা আক্রমণ ব্রাজিলের রক্ষণকে কয়েক দফা চাপে ফেলেছিল। তবে ফিনিশিংয়ের ঘাটতিতে সেসব সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি ম্যাচটিকে মোটেই হালকাভাবে নেননি। প্রথম একাদশেই ছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, অধিনায়ক মারকুইনহোস, দানিলো ও ডগলাস সান্তোসের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলার। শুরু থেকেই বাঁ প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ভিনিসিয়ুসকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে ব্রাজিল। তাকে সামলানোর দায়িত্ব ছিল অভিষেক সিংয়ের ওপর। কয়েকবার ড্রিবল করে বেরিয়ে গেলেও ভারতীয় ডিফেন্ডার শেষ পর্যন্ত তাকে অনুসরণ করে গেছেন। ফলে প্রথমার্ধের বড় সময় ব্রাজিলের আক্রমণ প্রত্যাশিত ধার পায়নি। ভারতও শুধু রক্ষণে আটকে থাকেনি। সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে উঠেছে। রায়ান, মনবীর ও অভিষেকের গতি ব্যবহার করে ব্রাজিলের বক্সে ঢোকার চেষ্টা করেছে তারা। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে শেষ পাস ও শটের জায়গায় যে ঘাটতি রয়েছে, সেটিই বারবার স্পষ্ট হয়েছে। ২৮ মিনিটে সেই ঘাটতির সুযোগ নিয়ে নয়, বরং নিজেদের ভুলেই ভারত গোল হজম করে। ডান দিক থেকে বল পেয়ে এস্তেভাও ফাঁকা জায়গায় শট নেন। বলটি গুরপ্রীতের নাগালের মধ্যেই ছিল। কিন্তু সেটি নিয়ন্ত্রণে নিতে না পেরে হাতের নিচ দিয়ে জালে পাঠিয়ে দেন ভারতীয় গোলরক্ষক। প্রথম গোলের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ৪২ মিনিটে দ্বিতীয় গোল। এস্তেভাওয়ের পাস থেকে পেদ্রো শট নেন। গুরপ্রীত পা দিয়ে বল ঠেকানোর চেষ্টা করেন। বল তার গ্লাভসে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায়। দুটি গোলই ভারতের জন্য বিশেষ হতাশার। কারণ প্রথমার্ধের অধিকাংশ সময় ব্রাজিলকে স্বাভাবিক গতিতে আক্রমণ করতে দেয়নি ভারত। গুরপ্রীতের ভুল দুটি না হলে বিরতিতে গোলশূন্য অবস্থায় যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। তবে ভারতের কোচ খালিদ জামিল ম্যাচের পর গুরপ্রীতকে একা দায়ী করেননি। তিনি বলেন, ‘গুরপ্রীত ভারতের অন্যতম সেরা গোলকিপার। দুটো ম্যাচ দিয়ে তাকে বিচার করা উচিত নয়। পরের ম্যাচে সে ফিরে আসবে। গুরপ্রীতের একার জন্য গোল হয়নি। ডিফেন্ডারও কাছে ছিল। ওদের মুভটাও ভালো হয়েছে। সবারই দোষ রয়েছে।’ গুরপ্রীতকে নিয়ে সমালোচনার মধ্যেও খালিদের বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উঠে এসেছে—ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে শুধু গোলরক্ষকের ভুল দিয়ে ভারতের পারফরম্যান্স বিচার করতে চান না তিনি। তার মতে, দলের সবাই ম্যাচটির গুরুত্ব বুঝে খেলেছে এবং ভারত সময় নষ্ট না করে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করেছে। চার গোলের হার সত্ত্বেও ভারতের পারফরম্যান্স নিয়ে ইতিবাচক ছিলেন ব্রাজিল কোচ আনচেলত্তি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ভারত ভালো খেলেছে এবং রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি পাল্টা আক্রমণেও উঠেছে। তার মতে, প্রথম গোল করতে ব্রাজিলকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে। গোল পাওয়ার পরই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়েছে। ভারতীয় দলের লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করে আনচেলত্তি খালিদ জামিলকেও বার্তা দিয়েছেন। খালিদের ভাষায়, ম্যাচের পর ব্রাজিল কোচ বলেছেন, ‘তোমরা ভালোই খেলেছ। এভাবেই খেলে যাও।’ তরুণ ফুটবলারদের পারফরম্যান্স নিয়েও সন্তুষ্ট আনচেলত্তি। তার মতে, এ ধরনের ম্যাচ তরুণদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে কিছু খেলোয়াড়ের আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। ভারতের জন্য তাই ৪-০ ব্যবধানের হার একেবারে নেতিবাচক বার্তা বহন করছে না। বরং ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে রক্ষণ সংগঠিত রাখা, ভিনিসিয়ুসকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা এবং দ্বিতীয়ার্ধে একাধিক গোলের সুযোগ তৈরি করা দলের সম্ভাবনার কিছু দিক সামনে এনেছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না—নিজেদের সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা এবং গোলরক্ষণের ধারাবাহিকতা বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে গুরপ্রীতের ভুল নিয়ে বিতর্কের বাইরে এসে ভারতের গোলরক্ষক পজিশন নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথমার্ধের দুটি ভুল ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে কোচ খালিদ প্রকাশ্যেই তার আস্থার জায়গাটি পরিষ্কার করেছেন। ভারতের সামনে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ খুব দ্রুতই আসছে। আগামী ৬ অক্টোবর উরুগুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। ব্রাজিলের বিপক্ষে যে সাহসী ফুটবল ভারত দেখিয়েছে, তার সঙ্গে যদি রক্ষণে ভুল কমানো এবং আক্রমণে ফিনিশিংয়ের উন্নতি যোগ করা যায়, তাহলে পরের ম্যাচে দলটির পারফরম্যান্সের মূল্যায়নও হবে ভিন্নভাবে। যুবভারতীতে ব্রাজিলের কাছে হার তাই ভারতের জন্য শুধু ৪-০ ব্যবধানের পরাজয় নয়। এটি একই সঙ্গে দেখিয়ে দিয়েছে—বিশ্বের শীর্ষ দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেই লড়াইকে ফলাফলে রূপ দিতে এখনো বেশ কিছু জায়গায় উন্নতির প্রয়োজন।