প্রকাশ :: ... | ... | ...

হালান্ডের রেকর্ডের রাতে সিটির হার, প্রথমার্ধেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় পিএসজি


সংযুক্ত ছবি

দুই মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে ম্যানচেস্টার সিটিকে চাপে ফেলে পিএসজি; বিরতির পর হালান্ডের জোড়া গোলে জমে ওঠে লড়াই। শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা ইংল্যান্ডের ইতিহাদ স্টেডিয়ামে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটিকে ৪-২ গোলে হারিয়েছে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। বুধবার রাতে পিএসজির হয়ে গোল করেন দেজিরে দুয়ে, উসমান দেম্বেলে, ভিতিনিয়া ও মাগনেস আকলিউশ। সিটির হয়ে দুটি গোলই করেন আর্লিং হালান্ড। এই হারে নতুন কোচ এনজো মারেস্কার অধীনে মৌসুমের প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পেল সিটি। অন্যদিকে প্রথমার্ধের দাপট এবং প্রতিপক্ষের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা সামলে জয় নিশ্চিত করে পিএসজি। ফলাফলটি শুধু দুই দলের শক্তির পার্থক্য তুলে ধরেনি, দেখিয়েছে একই ম্যাচে ফুটবলের দুই ভিন্ন চেহারাও। প্রথমার্ধে পিএসজির গতি, নিখুঁত পাস ও আক্রমণাত্মক বিন্যাসের সামনে সিটিকে অসহায় মনে হয়েছে। বিরতির পর চিত্র বদলে দিয়ে সিটি একের পর এক আক্রমণ করেছে, গোল করেছে এবং ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। কিন্তু প্রথমার্ধে তৈরি হওয়া বড় ব্যবধান শেষ পর্যন্ত আর ঘোচাতে পারেনি তারা। প্রথমার্ধে পিএসজির দাপট ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণে ধার ও পরিকল্পনার ছাপ রাখে পিএসজি। ১৩ মিনিটে দূরপাল্লার শটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন দেজিরে দুয়ে। মাত্র ৯৯ সেকেন্ড পর দেম্বেলের গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ হয়। পিএসজির দ্রুতগতির আক্রমণ ও সতীর্থদের সঙ্গে দেম্বেলের সমন্বয় সিটির রক্ষণকে অপ্রস্তুত করে দেয়। ৩২ মিনিটে ভিতিনিয়ার গোল প্রথমার্ধের আধিপত্যকে আরও স্পষ্ট করে। ওয়ারেন জাইরে-এমেরির তাৎক্ষণিক ফ্লিক থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে জোরালো শটে জাল খুঁজে নেন তিনি। বিরতিতে ৩-০ গোলে এগিয়ে থাকা পিএসজির জন্য এটি ছিল প্রায় নিখুঁত প্রথমার্ধ। বিপরীতে সিটির রক্ষণে খেলোয়াড়দের মধ্যে দূরত্ব, ভারসাম্য ও সমন্বয়ের ঘাটতি চোখে পড়ে। পিএসজির সাফল্যের মূল জায়গা ছিল শুধু গোল করা নয়, বল দখলে রাখার পাশাপাশি বল হারানোর পর দ্রুত তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা। সিটির পরিচিত পাসনির্ভর ফুটবলের বিপরীতে পিএসজি নিজেরাই সেই ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। আক্রমণে তারা ছিল দ্রুত, আর সিটির ভুল কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে ছিল কার্যকর। বিরতির পর বদলে যায় সিটি দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে ফিরে সিটি অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ৫৩ মিনিটে হালান্ডের গোলে ব্যবধান কমে ৩-১ হয়। এতে স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ৬২ মিনিটে গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার ভুল সামলে মাগনেস আকলিউশ পিএসজির চতুর্থ গোলটি করেন। ব্যবধান আবার তিন গোলে পৌঁছালেও সিটির আক্রমণ থামেনি। ৭৫ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে হালান্ড ব্যবধান ৪-২ করেন। তাঁর গোলের পর ম্যাচে উত্তেজনা আরও বাড়ে। সিটি আরও সুযোগ তৈরি করে; বল পোস্টে লেগেও ফিরে আসে। আক্রমণের ধার ও সুযোগ সৃষ্টির দিক থেকে দ্বিতীয়ার্ধে সিটির পারফরম্যান্স ছিল প্রথমার্ধের তুলনায় অনেক ভালো। কিন্তু সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যর্থতা এবং পিএসজির গোলরক্ষকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ তাদের প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শেষ দিকে সিটির সাবেক খেলোয়াড় ফেররান তোরেসের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন দোন্নারুম্মা। ফলে শেষ মুহূর্তে ব্যবধান কমিয়ে ম্যাচে আরও চাপ তৈরির সুযোগও হাতছাড়া করে সিটি। মারেস্কার স্বীকারোক্তি, এনরিকের সতর্ক মূল্যায়ন ম্যাচ শেষে সিটির কোচ এনজো মারেস্কা প্রথমার্ধের দুর্বলতা স্বীকার করেন। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল ‘অদ্ভুত’ এক ম্যাচ। দুই মিনিটের মধ্যে দুই গোল হজম করায় তাঁর দল বড় সমস্যায় পড়ে যায়। তবে দ্বিতীয়ার্ধে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি। মারেস্কার মতে, বিরতির পর সিটি অনেক সুযোগ তৈরি করেছে এবং খেলায় নিজেদের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছে। মারেস্কা বলেন, পিএসজির মতো দলের বিপক্ষে সমানে সমান লড়াই করতে হলে সাহসী হতে হয়। প্রথমার্ধে তাঁর দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ভারসাম্য ও পারস্পরিক দূরত্ব ঠিক ছিল না। বিরতির পর পরিবর্তন ও কৌশলগত সমন্বয়ের মাধ্যমে দল অনেক ভালো খেলেছে। তাঁর বিশ্বাস, সিটি পিএসজির কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে এবং এই ম্যাচ থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোতে পারবে। অন্যদিকে পিএসজির কোচ লুইস এনরিকে জয় পেয়েও দ্বিতীয়ার্ধের পারফরম্যান্স নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন। তিনি বলেন, ম্যাচের দুই অর্ধে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমার্ধে তাঁর দল নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ফুটবল খেলেছে এবং সিটির চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। তবে ৩-০ গোলে এগিয়ে থাকার পরও ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে—এমন ভাবার সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ার্ধে পিএসজিকে যথেষ্ট ভুগতে হয়েছে; সিটি আরও গোল করতে পারত, এমনকি পিএসজি ম্যাচটি হারাতেও পারত। দুই কোচের বক্তব্যেই ম্যাচের মূল চিত্র ফুটে উঠেছে। মারেস্কার কাছে এটি প্রথমার্ধের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্বিতীয়ার্ধের ইতিবাচক দিকগুলো ধরে রাখার পরীক্ষা। এনরিকের কাছে এটি একই সঙ্গে পিএসজির আক্রমণাত্মক শক্তির প্রমাণ এবং বড় ব্যবধানের লিড ধরে রাখার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার বার্তা। হালান্ডের রেকর্ড, কিন্তু দলীয় জয় পিএসজির দুটি গোল করে হালান্ড ব্যক্তিগতভাবে আরও একটি স্মরণীয় রাত কাটিয়েছেন। প্রথম গোলের মাধ্যমে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে সার্জিও আগুয়েরোর গোলসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যান তিনি। দ্বিতীয় গোলের পর প্রতিযোগিতাটিতে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৬১—মাত্র ৬০ ম্যাচে। তবে ব্যক্তিগত অর্জন সিটির পরাজয় ঠেকাতে পারেনি। ম্যাচটি সিটির জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত প্রিমিয়ার লিগের রায়ের পর ঘরের মাঠে তাদের প্রথম ম্যাচ হওয়ায়। ক্লাবটি অভিযোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করছে। সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলাও মাঠে উপস্থিত ছিলেন, সঙ্গে ছিলেন ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তবে মাঠের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্র ছিল পিএসজির দুর্দান্ত প্রথমার্ধ এবং সিটির অসম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তন। এই ম্যাচের শিক্ষা স্পষ্ট: বড় দলের বিপক্ষে শুধু আক্রমণে প্রতিভা থাকলেই হয় না, পুরো ৯০ মিনিটে মনোযোগ ও ভারসাম্য ধরে রাখাও জরুরি। সিটি দ্বিতীয়ার্ধে সেই সামর্থ্যের ঝলক দেখিয়েছে, কিন্তু প্রথমার্ধের ভুলের মূল্য দিতে হয়েছে। পিএসজি জিতেছে তাদের আক্রমণাত্মক দক্ষতায়; আর এনরিকের দলও বুঝেছে, বড় ব্যবধানের লিড পেলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যায় না।