ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুলকে ডিবিতে নেওয়া হয়েছে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তিন সদস্যের ওই কমিটি রাকিবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এর মধ্যে একজন যুগ্ম পুলিশ কমিশনারকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটিতে পুলিশের সাইবার বিভাগের একজন কর্মকর্তাও রয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে ডিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য জানান। পরে বৃহস্পতিবার রাতেই রাকিবুল হাসানকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ছড়িয়ে পড়া অডিওর বিষয়ে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাঁকে ডিবিতে নেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তটি ডিবি সরাসরি করছে, নাকি ডিএমপির গঠিত কমিটির অধীনে হচ্ছে—এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে চাননি ওই কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে রাকিবুল হাসান ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন বলে জানা যায়। এর আগে অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার প্রশাসনিক কারণে রাকিবুল হাসানকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। ডিএমপি কমিশনার মো. মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদের সই করা অফিস আদেশে তাঁকে ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। আদেশটি ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। রাকিবুল হাসান ডিএমপির গুলশান বিভাগের ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নামে একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে একজনের কণ্ঠে সরকার, প্রশাসন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য শোনা যায়। পুলিশের একাধিক সূত্র প্রাথমিকভাবে অডিওর কণ্ঠটি রাকিবুল হাসানের বলে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। তবে অডিওটির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। ছড়িয়ে পড়া অডিওতে ওই ব্যক্তিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা এবং পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। সেখানে বলা হয়, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না। পুলিশের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা নিয়েও ওই ব্যক্তিকে দুর্বলতার কথা বলতে শোনা যায়। অডিওতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। একই সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও মন্তব্য করা হয়। বক্তাকে বলতে শোনা যায়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, কিন্তু মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা তা করছেন না। এ ছাড়া পুলিশে পদায়ন ও বদলি নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও অডিওতে রয়েছে। সেখানে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ঘিরে পদায়নে অর্থ নেওয়ার দাবি করা হয়। এমনকি একটি পদায়নের ক্ষেত্রে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগও করতে শোনা যায়। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি সত্য কি না, তা এখনো পুলিশের তদন্তে যাচাই হয়নি। অডিওতে বক্তাকে পুলিশের চাকরি ও মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায়। তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতনরা সুযোগ-সুবিধা নেবেন আর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ করবেন—এভাবে পরিস্থিতি চলতে পারে না। অডিও ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিষয়টি নিয়ে পুলিশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যেই রাকিবুল হাসানকে ক্যান্টনমেন্ট থানার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে ডিএমপির অফিস আদেশে অডিওর কোনো বক্তব্য বা অভিযোগের উল্লেখ না করে তাঁর প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে শুধু ‘প্রশাসনিক কারণ’ বলা হয়েছে। ডিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অডিওটির বিষয়বস্তু পরীক্ষা করা হবে। প্রয়োজন হলে তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবেই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে এবং রাকিবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এখন তদন্তে মূলত অডিওটির উৎস, কণ্ঠের পরিচয়, কথোপকথনের প্রেক্ষাপট এবং বক্তব্যগুলো সত্যিই রাকিবুল হাসানের কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হবে। পাশাপাশি অডিওটি সম্পাদিত বা খণ্ডিত কি না, কথোপকথনের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট কী এবং সেখানে উত্থাপিত অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে কি না, সেসবও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। রাকিবুল হাসানের সঙ্গে অডিওর বক্তব্য নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অডিওতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে পুলিশের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম বা পদায়নে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এদিকে অডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তাঁর প্রশাসনিক প্রত্যাহার এবং পরবর্তী তদন্ত—দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা হচ্ছে। পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা বিতর্কিত বক্তব্যের অডিও সামনে এলে তার সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া প্রশাসনিক ও তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ। রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত বিভাগীয় শাস্তির সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।