সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেনের পাশাপাশি পণ্য ও কনটেইনার পরিবহনে গুরুত্ব। একটি দীর্ঘ রেলযাত্রার মাধ্যমে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে হিমালয়ের পাদদেশের পঞ্চগড় থেকে বঙ্গোপসাগরের তীরের কক্সবাজার—দেশের ভৌগোলিকভাবে দুই প্রান্তকে রেলপথে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রায় ১ হাজার ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোর বাস্তবায়নে পাঁচটি পৃথক রেল প্রকল্পকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার পর্যন্ত রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। তবে পুরো করিডোর চালু করতে নতুন লাইন নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকে দ্বৈতগেজে রূপান্তর, নতুন সংযোগ তৈরি, সিগন্যালিং ও রেল অবকাঠামো সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শেষ করতে হবে। রেলওয়ে সূত্রে প্রকাশিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, পঞ্চগড়-কক্সবাজার করিডোর গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি অংশ হলো—সান্তাহার-বগুড়া, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ, টঙ্গী-আখাউড়া, লাকসাম-চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম-দোহাজারী। বিভিন্ন পর্যায়ে এসব অংশে নতুন লাইন নির্মাণ, বিদ্যমান লাইন উন্নয়ন ও দ্বৈতগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ রয়েছে। পুরো পরিকল্পনায় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা হচ্ছে। তবে পাঁচ প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা এক নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের হালনাগাদ প্রকল্প তালিকায় ঢাকা-টঙ্গী অংশে তৃতীয় ও চতুর্থ দ্বৈতগেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুরে দ্বৈতগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজ লাইনকে দ্বৈতগেজে রূপান্তরের প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। একই তালিকায় বগুড়া থেকে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন হয়ে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন দ্বৈতগেজ রেলপথ প্রকল্পের আগের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ অংশটিই এ করিডোরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘মিসিং লিংক’। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে রাজধানী ও পূর্বাঞ্চলে রেল যোগাযোগকে আরও সরাসরি করতে প্রায় ৮৬ কিলোমিটার নতুন দ্বৈতগেজ মূল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক—এআইআইবির আগস্ট ২০২৬-এর প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের মধ্যে প্রায় ৮৬ কিলোমিটার নতুন দ্বৈতগেজ রেললাইন নির্মাণের মাধ্যমে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা ও পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের দূরত্ব ও সময় কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। ব্যাংকটি এ প্রকল্পের জন্য ২৮ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব করেছে। এ প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও সাম্প্রতিক সময়ে এগিয়েছে। আগস্টে বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিবেশ, সামাজিক, লিঙ্গ ও জলবায়ু সমীক্ষা হালনাগাদ এবং প্রকল্পের কারিগরি প্রস্তুতির জন্য পরামর্শক নিয়োগের আগ্রহপত্র আহ্বান করে। ১ অক্টোবর আবার প্রকল্পের পরামর্শকসংক্রান্ত নতুন আগ্রহপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ বগুড়া-সিরাজগঞ্জ অংশে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু এটিকে ইতোমধ্যে পূর্ণ নির্মাণপর্বে থাকা প্রকল্প হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। এই সংযোগটি তৈরি হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগের একটি বড় সমস্যা কমবে। বর্তমানে ওই অঞ্চলের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক পথ ঘুরে যেতে হয়। এআইআইবির নথিতেও বিদ্যমান যোগাযোগকে দীর্ঘ ও তুলনামূলক অদক্ষ হিসেবে উল্লেখ করে নতুন বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সংযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। নতুন লাইনটি উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী ও পূর্বাঞ্চলমুখী রেলপথের জন্য বিকল্প এবং অপেক্ষাকৃত সরাসরি পথ তৈরি করতে পারে। পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গেজের সামঞ্জস্য। দেশের রেল নেটওয়ার্কে এখনো মিটারগেজ ও ব্রডগেজ—দুই ধরনের রেলপথ রয়েছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্বৈতগেজ অবকাঠামো বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের চলমান প্রকল্প তালিকায় চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজকে দ্বৈতগেজে রূপান্তর এবং ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর অংশে দ্বৈতগেজ লাইন বাড়ানোর কাজের তথ্য রয়েছে। করিডোরের পূর্বাঞ্চলীয় অংশেও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা ও টঙ্গী অংশে ট্রেনের চাপ কমানো, একাধিক লাইন তৈরি এবং সিগন্যালিং সক্ষমতা বাড়ানো হলে উত্তরাঞ্চল থেকে আসা ট্রেনকে পূর্বাঞ্চলের দিকে পাঠানোর সুযোগ বাড়বে। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকল্প তালিকায় ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ দ্বৈতগেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর দ্বৈতগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের কাজ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত চলমান থাকার তথ্য রয়েছে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশটিও কক্সবাজারমুখী রেল করিডোরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে এই মিটারগেজ লাইনকে দ্বৈতগেজে রূপান্তরের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ কক্সবাজার পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালুর পর উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ট্রেন আনার ক্ষেত্রে গেজ-সামঞ্জস্য ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নটি সরাসরি এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। এই করিডোরের সম্ভাব্য সুবিধা শুধু যাত্রী পরিবহনে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত চট্টগ্রাম ও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বাজারে নেওয়া গেলে পরিবহনব্যবস্থায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে সামুদ্রিক মাছ, লবণ, শুঁটকি ও অন্যান্য পণ্য উত্তরাঞ্চলের বাজারে পাঠানোর ক্ষেত্রে রেলকে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এর জন্য শুধু রেললাইন নির্মাণ যথেষ্ট নয়; আধুনিক মালবাহী ওয়াগন, পণ্য ওঠানো-নামানোর অবকাঠামো, কনটেইনার টার্মিনাল, সংরক্ষণ সুবিধা এবং নির্ভরযোগ্য সময়সূচিও নিশ্চিত করতে হবে। কনটেইনার পরিবহনও এ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। বাংলাদেশ রেলওয়ের চলমান প্রকল্প তালিকায় রেলের মাধ্যমে কনটেইনার পণ্য পরিবহনের সুবিধা যাচাইয়ের জন্য আলাদা কারিগরি সহায়তা প্রকল্প রয়েছে। একই সঙ্গে ধীরাশ্রমে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো নির্মাণের লক্ষ্যে পুবাইল-ধীরাশ্রম রেল সংযোগ নির্মাণের প্রকল্পও রয়েছে। ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে পণ্য এনে রাজধানীকে এড়িয়ে চট্টগ্রামমুখী রেল পরিবহনের সক্ষমতা ভবিষ্যতে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। পর্যটনের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনাটি বড়। পঞ্চগড় দেশের উত্তর প্রান্তের পর্যটনসমৃদ্ধ অঞ্চল; অন্যদিকে কক্সবাজার দেশের প্রধান সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক পর্যটন গন্তব্য। সরাসরি রেল যোগাযোগ হলে একটি দীর্ঘ রেলযাত্রার মাধ্যমে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে পর্যটন বাড়াতে ট্রেন চালু করাই যথেষ্ট নয়; স্টেশনভিত্তিক পরিবহন, আবাসন, পর্যটন অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থারও উন্নয়ন প্রয়োজন। এই করিডোর বাস্তবায়নে শুধু পাঁচটি প্রকল্পের কাজ শেষ করলেই হবে না। একটি অংশে লাইন তৈরি হলেও অন্য অংশে সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে সরাসরি দীর্ঘপথের ট্রেন চালানো কঠিন হবে। বিশেষ করে ঢাকা-টঙ্গী, টঙ্গী-আখাউড়া ও চট্টগ্রামমুখী অংশে ট্রেনের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় নতুন দীর্ঘপথের আন্তঃনগর ও মালবাহী ট্রেনের জন্য পর্যাপ্ত সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সময়সূচি, রক্ষণাবেক্ষণ, ইঞ্জিন-কোচ এবং চালকসহ জনবল ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাও প্রয়োজন হবে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় পঞ্চগড়-কক্সবাজার করিডোরে নতুন আন্তঃনগর ট্রেনসহ বিপুলসংখ্যক ট্রেন চালানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন রেলওয়ে সূত্রে প্রায় ২০টি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন এবং দৈনিক প্রায় আড়াইশ ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতার কথা বলা হলেও এগুলোকে এখনই চূড়ান্ত ট্রেন পরিচালন পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অবকাঠামোর কাজ শেষ হওয়ার পর চাহিদা, সক্ষমতা, সময়সূচি ও রোলিংস্টক বিবেচনায় নিয়ে ট্রেন সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। এখানেই প্রকল্পটির বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার সমন্বিত পরিকল্পনা একাধিক প্রকল্প ও উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ অংশে এআইআইবির অর্থায়নের প্রস্তাব ও পরামর্শক নিয়োগের সাম্প্রতিক কার্যক্রম দেখাচ্ছে যে পুরো করিডোর এখনো প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন স্তরে রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব সংযোগ শেষ করতে হলে প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন, দরপত্র, জমি অধিগ্রহণ, নির্মাণ এবং পারস্পরিক সমন্বয় একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা হলো পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্কের গেজ ও অবকাঠামোগত পার্থক্য। পঞ্চগড়-কক্সবাজার করিডোরের পরিকল্পনা সেই বিভাজন কমানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পূর্বাঞ্চলের শিল্প ও বন্দর, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের পর্যটন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন—সবকিছুকে একই রেল নেটওয়ার্কে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেলপথ শুধু একটি দীর্ঘ দূরত্বের সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নয়; এটি দেশের বিচ্ছিন্ন রেল অবকাঠামোকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কে আনার বড় পরীক্ষা। প্রায় ১ হাজার ৭৭ কিলোমিটারের এই করিডোর বাস্তবে কত দ্রুত গড়ে ওঠে, তার ওপর নির্ভর করবে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে সমুদ্রবন্দর ও পর্যটননগরী পর্যন্ত রেলের নতুন অর্থনৈতিক সংযোগ কতটা কার্যকর হয়।