প্রকাশ :: ... | ... | ...

পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতের সঙ্গে সংলাপ চায় বাংলাদেশ


সংযুক্ত ছবি

ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও অনিষ্পন্ন বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে এগোতে চায় বাংলাদেশ। দেশের স্বার্থে ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি রয়েছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে দেশের জনগণের সমর্থন ও প্রত্যাশাও সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। ভারতের সঙ্গে পানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চটা আদায় করতে চাইবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর মতে, দুই দেশের নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে আন্তরিকতা থাকলে দীর্ঘদিনের পানি সমস্যার সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ইতিবাচক সমাধানের পথ তৈরি করা সম্ভব। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা : তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন করে কার্যকর সংলাপ শুরুর প্রস্তুতির কথাও জানান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, পানি ইস্যুতে সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছে। এখন ভারতীয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নামের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। দুই দেশের পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ভারতের কাছে নাম চেয়েছি, যাতে আমাদের প্রতিনিধিরা তাদের সঙ্গে সংলাপ ও আলোচনা শুরু করতে পারেন। এখন আমাদের তাদের জবাবের অপেক্ষা করতে হবে।’ ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে জবাব পাওয়া যেতে পারে। ভারতীয় পক্ষের জবাব পাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে পরবর্তী দফার পানিচুক্তি নবায়নের পথ প্রশস্ত হবে বলে আশা করছেন তিনি। বাংলাদেশ-ভারতের অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে। হুমায়ুন কবির জানান, দুই দেশের ১৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কথাবার্তা ও আলোচনা চলছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। শুধু একটি বা কয়েকটি নদীর বিষয় নয়, সামগ্রিক পানি সহযোগিতাকে আঞ্চলিক সহযোগিতার বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে কথাবার্তা ও আলোচনা চলছে এবং চলবে। আমাদের অবস্থান থেকে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। দুই দেশের মধ্যে যদি আন্তরিকতা থাকে—সিনিয়র অফিসিয়াল লেভেলে, লিডারশিপ বা নেতৃত্ব পর্যায়ে এবং পানিবিষয়ক আলোচনায় যারা দুই দিক থেকে কাজ করবেন, তাদের মধ্যে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’ বাংলাদেশের উদ্যোগের পাশাপাশি ভারত সরকারও বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে বলে জানান তিনি। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পর্যায়ে সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি হলে পানি নিয়ে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়গুলো দেখা হচ্ছে। যদি নেতৃত্বের মানসিকতা থাকে যে তারা এগিয়ে এসে সহযোগিতা করবে, তবে আমরা অবশ্যই এই সমস্যার একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ইতিবাচক সমাধান পাব।’ পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান কেবল দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল নয়—আন্তর্জাতিক আইনের নীতিও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, আন্তর্জাতিক আইনের যে অবস্থানগুলো রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের আলোচনার অন্যতম ভিত্তি। তিনি বলেন, ‘আলোচনা, ডায়ালগ এবং কূটনীতির মাধ্যমেই কেবল এই বিষয়গুলো সমাধান করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক আইনের যে অবস্থানগুলো রয়েছে, সেগুলোকেও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।’ পানি নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা থাকলে আলোচনার মাধ্যমেই বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যকর যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য পানি ইস্যু শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক বিষয় নয়; দেশের জনগণের প্রত্যাশা ও স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িত—এমন অবস্থানই তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি, জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং কূটনৈতিক আলোচনাকে একই সঙ্গে বাংলাদেশের পানি কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুনভাবে কাজ করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘আমরা অতীত বা সাধারণ ধারার মতো কাজ না করে গুণগত উপায়ে দেশের ভবিষ্যতের সংকট ও বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে চাই।’ ফলে ভারতের সঙ্গে পানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সংলাপ শুরুর ওপর। ভারতীয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নাম পাওয়ার পর আলোচনা শুরু হলে দীর্ঘদিনের পানিবণ্টন প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান কতটা কাছাকাছি আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।