প্রকাশ :: ... | ... | ...

বঙ্গোপসাগরকে সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে চায় বাংলাদেশ: মুনীরুজ্জামান


সংযুক্ত ছবি

বঙ্গোপসাগরকে যেকোনো ধরনের বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রাখতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ভারত ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনা কমানো এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশ সামুদ্রিক স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক সংযোগ ও জলবায়ু নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান। শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের একটি অধিবেশনে প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। মুনীরুজ্জামানের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, ভারত-চীন প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক সংযোগে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকা। চীন ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশ কী ভূমিকা রাখতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে মুনীরুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ এশিয়া এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি পক্ষ। তাঁর মতে, ভারত ও চীন—উভয় দেশের কাছেই বাংলাদেশের দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই অঞ্চলে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। বঙ্গোপসাগর শুধু দক্ষিণ এশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভারত মহাসাগর ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্ষেত্রেও এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ভারত মহাসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিককে ঘিরে বিভিন্ন কৌশলগত পরিকল্পনায় বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মুনীরুজ্জামানের ভাষ্য, এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। এটি ভারত ও চীন—দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, **‘আমরা বঙ্গোপসাগরকে যে কোনো বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রাখতে চাই।’** বিশ্লেষকদের কাছে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বের একটি কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উপকূলীয় অবস্থান থেকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এ অঞ্চলের সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। আঞ্চলিক সংযোগের প্রসঙ্গ তুলে মুনীরুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ভূ-কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশ যদি চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত একটি স্থলপথ বা করিডোর তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়বে এবং এতে ভারত ও চীন উভয়ই উপকৃত হতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে নীতি আলোচনায়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের অন্য অধিবেশনেও বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে বন্দর, রেল, সড়ক, নৌপথ, সীমান্ত অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপ দিতে হলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। মুনীরুজ্জামান জলবায়ু পরিবর্তন ও নিরাপত্তার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ বর্তমানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। তাঁর মতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বাংলাদেশের ভূমিকা শুধু দেশের জন্য নয়, ভারত ও চীনের জন্যও উপকারী হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও বাস্তুচ্যুতির মতো ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে জলবায়ু নিরাপত্তা ক্রমেই সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তার আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে। বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের এবারের আলোচনায় ভারত-চীন প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্ব পেয়েছে। একই অনুষ্ঠানের ‘পাওয়ার অ্যান্ড প্রুডেন্স: ম্যানেজিং গ্রেট-পাওয়ার কম্পিটিশন উইদাউট কনফ্লিক্ট’ শীর্ষক আলোচনায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ এবং অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। তিনি দুই দেশের মধ্যে চলমান বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ওপর গুরুত্ব দেন। এই প্রেক্ষাপটে মুনীরুজ্জামানের বক্তব্যে বঙ্গোপসাগরকে সামরিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল অঞ্চল হিসেবে রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংযোগ ও জলবায়ু নিরাপত্তাকেও একই কাঠামোর মধ্যে দেখার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব কেবল ভূরাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও। সমুদ্রবন্দর, সামুদ্রিক বাণিজ্য, মৎস্যসম্পদ, জ্বালানি পরিবহন এবং নীল অর্থনীতির সম্ভাবনার সঙ্গে বঙ্গোপসাগর সরাসরি যুক্ত। ফলে সমুদ্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত। মুনীরুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও বাংলাদেশ দুই দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ বজায় রেখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরকে শান্তিপূর্ণ রাখা, আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং জলবায়ু নিরাপত্তায় সহযোগিতা জোরদার করা বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের আলোচনায় এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামনে থাকা একটি বড় বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়েছে—বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক গুরুত্ব যত বাড়ছে, ততই এই অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের অবস্থান তাই শুধু উপকূলীয় একটি দেশের নয়; আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সামুদ্রিক স্থিতিশীলতার আলোচনাতেও দেশটির ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।