বাংলাদেশে সংঘটিত বেশিরভাগ অপরাধের পেছনে কোনো না কোনোভাবে জমি-জমা নিয়ে বিরোধের যোগসূত্র পাওয়া যায় বলে মন্তব্য করেছেন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-৪-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান। তাঁর দাবি, সম্প্রতি মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার, দক্ষিণ মানিকদীর নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এবং সাভারের আশুলিয়ার একটি মাদ্রাসায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় ছায়াতদন্ত করে চাঁদাবাজির বিষয় পাওয়া যায়নি; বরং জমি নিয়ে বিরোধই এসব ঘটনার মূল কারণ। মঙ্গলবার ঢাকার কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের এক কথিত হোতাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। সম্প্রতি আলোচিত কয়েকটি হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে এক প্রশ্নের জবাবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, এসআরবি নিয়মিত কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি আলোচিত ঘটনাগুলোর কারণ অনুসন্ধানেও তারা ছায়াতদন্ত করেছে। রাড্ডা, নিউ গিনি প্রপার্টিজ ও আশুলিয়ার মাদ্রাসায় হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনার ক্ষেত্রে ছায়াতদন্ত করে দেখা গেছে, মূল বিষয় চাঁদাবাজি নয়; জমি নিয়ে বিরোধ থেকেই সমস্যাগুলোর সূত্রপাত হয়েছে। তিনি বলেন, জমি-জমা নিয়ে বিরোধ থেকে মারামারি, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের ব্যবহারসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটতে পারে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে এসআরবি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তবে একই সঙ্গে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে অনেক অপরাধ কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, অপরাধের মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই জমি-জমা নিয়ে বিরোধের সূত্র পাওয়া যায়। তাঁর ভাষ্য, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা গেলে এর প্রভাবে অনেক অপরাধ এমনিতেই কমে আসবে। তবে সম্প্রতি আলোচিত তিনটি ঘটনার ক্ষেত্রে এসআরবির ছায়াতদন্তে কী ধরনের তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি। এসব ঘটনায় মামলা হওয়ার কথা উল্লেখ করে এসআরবি-৪ অধিনায়ক বলেন, তদন্ত চলার আগে বিস্তারিত কিছু বলা ঠিক হবে না। এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যালয়ে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই রাতে স্থাপনাটির একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি একটি পাকা ভবনের আল্ট্রাসোনোগ্রাম কক্ষ, টিকাদান কক্ষ ও ল্যাবরেটরিসহ পাঁচটি কক্ষের দরজা-জানালা ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন মালামাল নিয়ে গেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ওষুধ ও টিকাদানসামগ্রী, আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও আসবাবপত্র রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। এর একদিন পর, ২৬ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরসংলগ্ন দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আবাসন প্রকল্পের কার্যালয়সহ আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার অভিযোগ ওঠে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওও রয়েছে বলে জানা যায়। এর পরদিন সাভারের আশুলিয়ায় ‘তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাযিল’ নামে একটি মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। পরপর এসব ঘটনার পর রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘাত, দখল ও ভাঙচুরের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এসআরবি-৪ অধিনায়ক অবশ্য এসব ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত-ফল প্রকাশ করেননি। ফলে কোন ঘটনায় কার সঙ্গে কার জমি নিয়ে বিরোধ ছিল, বিরোধের ধরন কী এবং হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট হচ্ছে না। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, জমি-জমা নিয়ে বিরোধের কারণে অপরাধের সুযোগ তৈরি হলেও মারামারি, চাঁদাবাজি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে এসআরবির অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিলে অপরাধের একটি বড় উৎস কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।