পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে যখন শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসে, তখন তাদের সামনে শুধু বই-খাতা নয়, থাকে অনেক প্রতিকূলতাও। দুর্গম থানচির তিন্দুতে একটি বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখার লড়াইও ছিল তেমনই কঠিন। শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের। নিয়মিত বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই অনেক পরিবারের। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া নিয়ে তৈরি হয় দীর্ঘ সংকট। সেই সংকটে অন্য কারও দিকে তাকিয়ে থাকেননি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। স্কুলের খাতা-কলমের পাশাপাশি হাতে তুলে নিয়েছিলেন নৌকার হাল। ছুটির দিনে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করেছেন থানচি-তিন্দু-রেমাক্রী নৌপথে। সেই আয় থেকে দিয়েছেন সহকর্মীদের বেতন। কখনো একই নৌকায় শিক্ষার্থীদেরও নিরাপদে পারাপার করেছেন। মাস কয়েক আগেও বামং খিয়াং মিংলেনের এই গল্প ছিল দুর্গম পাহাড়ের একটি বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখার নীরব সংগ্রামের গল্প। আজ সেটিই পেয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছে ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র। এই ১০২ জনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাছাই করা সাতজনের তালিকায় ছিলেন বামং খিয়াং মিংলেনও। সম্মাননা নিতে মঞ্চে ওঠার মুহূর্তটি তাই শুধু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি বিদ্যালয়, কয়েকজন সহকর্মী এবং পাহাড়ি জনপদের শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিনের সংগ্রামের গল্প। ### যে স্কুলের বেতন জোগাতে নৌকা বান্দরবান জেলা সদর থেকে প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দূরে এবং থানচি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরের তিন্দু ইউনিয়ন। পাহাড় আর সাঙ্গু নদীঘেরা এই জনপদে স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। একই বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বামং খিয়াং মিংলেন। তিনি কক্সবাজার সিটি কলেজ থেকে এমবিএ এবং পরে বিএড সম্পন্ন করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়টির সবচেয়ে বড় সংকট ছিল অর্থ। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তাঁদের অধিকাংশের পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। ফলে নিয়মিত বেতন আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ছয়জন শিক্ষক অল্প বেতনে এবং দুজন শিক্ষক বিনা বেতনে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এই বাস্তবতায় উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া ইঞ্জিনচালিত বোট নিয়ে ছুটির দিনগুলোতে নদীতে নামেন বামং খিয়াং মিংলেন। শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিনে থানচি থেকে তিন্দু, বড় পাথর ও রেমাক্রী এলাকার পথে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করতেন তিনি। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে নৌকা চালিয়ে তিনি প্রায় ৪৯ হাজার ১০০ টাকা আয় করেন। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকা সহকর্মীদের বেতন হিসেবে দেন। কেন নিজেই নৌকা চালান—এর ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন বামং খিয়াং মিংলেন। তাঁর ভাষ্য, অন্য চালক রাখলে মজুরি দিতে হয়; আবার আয়ের হিসাব নিয়েও সমস্যা হতে পারে। তাই বিদ্যালয়কে টিকিয়ে রাখতে নিজেই নৌকার হাল ধরেছেন। সহকারী শিক্ষক পাওয়াই ম্রো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, প্রধান শিক্ষক হয়েও বামং খিয়াংয়ের মধ্যে কোনো অহংকার নেই। তিনি নৌকা চালিয়ে যা আয় করেন, তা শিক্ষকদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেন। সেই সামান্য অর্থ দিয়েই তাঁরা সংসার চালানোর পাশাপাশি বিদ্যালয়ে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেওয়াই মারমার কাছেও তিনি শুধু প্রধান শিক্ষক নন। মেওয়াই বলেছিল, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করছেন।’ ### নৌকা থেকে জাতীয়করণ বামং খিয়াং মিংলেনের এই সংগ্রামের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর তা দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরেও আসে। ২৮ জুন জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরপর ১৩ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদ্যালয়টি সরকারি ঘোষণা করে। এখন এর নাম ‘তিন্দু সরকারি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়’। একই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্তীকরণের কথাও প্রজ্ঞাপনে বলা হয়। বিদ্যালয়টির জন্য স্থানীয় প্রশাসন একটি বোটের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ভবন নির্মাণ ও ছাত্রাবাস সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সহযোগিতায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ### এবার স্বীকৃতির মঞ্চে বিদ্যালয়টি সরকারি হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বামং খিয়াং মিংলেন উঠলেন জাতীয় সম্মাননার মঞ্চে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তাঁদের মধ্যে ৯৫ জন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাতজন প্রধানমন্ত্রীর বাছাই করা শিক্ষক। বামং খিয়াং মিংলেন তাঁদের একজন। একসময় যিনি সহকর্মীদের বেতন দেওয়ার টাকা জোগাড় করতে নদীতে নৌকা চালিয়েছেন, সেই শিক্ষকই সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নিলেন ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র। পেলেন ২ লাখ টাকার সম্মানীও। তবে এই স্বীকৃতির গল্পের সবচেয়ে বড় অংশ হয়তো টাকার অঙ্কে নয়। কারণ তাঁর নৌকা চালানোর গল্পের কেন্দ্রে ছিল একটি বিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রাখা। ছিল পাহাড়ি জনপদের শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ ধরে রাখার চেষ্টা। ছিল সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর দায়বোধ। বামং খিয়াং মিংলেনের লড়াই এখন আর শুধু তিন্দুর গল্প নয়। দুর্গম এলাকায় একটি বিদ্যালয় কীভাবে টিকে থাকে, একজন শিক্ষক কতটা দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে পারেন এবং শিক্ষার জন্য ব্যক্তিগত শ্রম কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে—তিন্দুর এই গল্প সেই প্রশ্নগুলোই সামনে এনে দিয়েছে। নৌকার হাল থেকে জাতীয় সম্মাননার মঞ্চ—বামং খিয়াং মিংলেনের এই পথচলায় তাই পাহাড়ের একটি ছোট বিদ্যালয়ের স্বপ্নও যেন সঙ্গে উঠে এসেছে।