প্রকাশ :: ... | ... | ...

দ্বিগুণ হয়েছে হিমালয়ের বরফ ক্ষয়ের হার, পরের বিপর্যয় কি আঁচ করা সম্ভব?


সংযুক্ত ছবি

পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের হিমবাহ ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এর ভয়াবহ একটি নজির সম্প্রতি দেখা গেছে নেপাল ও চীনের তিব্বতে। হিমালয়ের একটি নদী উপত্যকায় হঠাৎ পানি, পাথর, বরফ ও কাদার ভয়ংকর স্রোত নেমে এসে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতুসহ বিস্তীর্ণ জনপদ তছনছ করে দিয়েছে। বহু মানুষ ভেসে গেছেন, অনেকে চাপা পড়েছেন ধ্বংসাবশেষ ও ঘন কাদার নিচে। এই বিপর্যয়ের পর একটি প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে—উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ যখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন পরবর্তী এমন দুর্যোগ কোথায় বা কখন ঘটবে, তা কি বিজ্ঞানীরা আগে থেকে বুঝতে পারবেন? ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেপাল-তিব্বতের সাম্প্রতিক ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছে, বিজ্ঞানীরা এখনো তা খতিয়ে দেখছেন। প্রাথমিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক হাজার ফুট ওপর থেকে হিমবাহের একটি অংশ এবং সংলগ্ন পাহাড়ের বিশাল অংশ একসঙ্গে ধসে পড়ে। উপত্যকায় একসঙ্গে নেমে আসা বরফ ও পাথরের পরিমাণকে প্রায় ৭০টি গিজার মহাপিরামিডের সমপরিমাণ বলে তুলনা করা হয়েছে। এত বড় বিপর্যয় যে ঘটতে যাচ্ছে, তা আগে থেকে নির্দিষ্টভাবে অনুমান করা সম্ভব হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবী যত উষ্ণ হচ্ছে, হিমবাহ, পারমাফ্রস্ট ও উঁচু পাহাড়ি ঢাল তত অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ফলে বরফধস, ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা ও কাদা-পাথরের প্রবাহের মতো দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। হিমালয়ের পরিবর্তনের গতি কতটা উদ্বেগজনক, তার নতুন প্রমাণ দিয়েছে আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র বা আইসিমোড। সংস্থাটির ২০২৬ সালের দুটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের পর হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের হার আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পর পর্যবেক্ষণ করা কোনো কোনো হিমবাহে মোট বরফের পুরুত্ব ২৭ মিটার পর্যন্ত কমেছে। হিন্দুকুশ হিমালয়কে প্রায়ই এশিয়ার ‘পানির টাওয়ার’ বলা হয়। মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বরফভান্ডার এখানে। এখানকার বরফ ও তুষার থেকে উৎপত্তি বা পানি পায় সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রসহ এশিয়ার বড় বড় নদী। পাহাড় ও ভাটির অঞ্চল মিলিয়ে ২০০ কোটির বেশি মানুষ এই জলব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। আইসিমোডের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে আনুমানিক বরফের মজুতও প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে শূন্য দশমিক পাঁচ বর্গকিলোমিটারের কম আয়তনের ছোট হিমবাহগুলো। অথচ অঞ্চলটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ হিমবাহই এই ছোট আকারের শ্রেণিতে পড়ে। ছোট হিমবাহ দ্রুত হারিয়ে গেলে একদিকে উঁচু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্থানীয় পানির উৎস সংকুচিত হতে পারে, অন্যদিকে গলিত বরফের পানি জমে নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি বা পুরোনো হ্রদ বড় হতে পারে। দুর্বল প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তে নেমে আসতে পারে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফ। তবে হিমবাহের হ্রদ ফেটে যাওয়াই একমাত্র বিপদ নয়। পাহাড়ের ঢালে ঝুলে থাকা হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে পড়তে পারে, বরফের সঙ্গে পাথরের পাহাড়ও ধসে যেতে পারে। কখনো সেই ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি করে। পরে বাঁধ ভাঙলে কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও এমন একাধিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। হিমবাহ ও পাহাড়ের বড় অংশ নিচে নামার পর বিপুল পরিমাণ পাথর ও বরফ নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দিয়ে থাকতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে ছুটে যায়—এমন সম্ভাবনা তদন্ত করা হচ্ছে। তবে বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট ক্রম এখনো গবেষণাধীন। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার সম্পর্কও জটিল। কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূমিধস বা হিমবাহ ধসকে শুধু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফল বলে ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন পাহাড়ি অঞ্চলের যে মৌলিক পরিবেশ বদলে দিচ্ছে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। বিশেষ করে পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা ভূস্তর বড় উদ্বেগের কারণ। এই জমাট মাটি ও বরফ অনেক পাহাড়ি ঢালে পাথরকে একধরনের প্রাকৃতিক আঠার মতো ধরে রাখে। তাপমাত্রা বাড়লে পারমাফ্রস্ট গলে দুর্বল হতে থাকে। তখন পাথরের স্তর আলগা হয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে হিমবাহ পাতলা ও ছোট হলে বরফের ভেতরের চাপের ভারসাম্যও বদলে যায়। হিমবাহের চারপাশের খাড়া পাহাড়ের ঢালও বরফের সমর্থন হারিয়ে অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ একটি পরিবর্তন আরেকটি পরিবর্তনকে উসকে দিয়ে ‘ক্যাসকেডিং’ বা ধারাবাহিক দুর্যোগ তৈরি করতে পারে। ঝুঁকিটি শুধু হিমালয়ের নয়। নরওয়ে, আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, চিলি, গ্রিনল্যান্ড, আলাস্কা ও আল্পসের মতো পৃথিবীর বহু হিমবাহ অঞ্চলে উষ্ণায়নের সঙ্গে পাহাড়ি অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ ধরনের ধসের পরিণতি স্থানভেদে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। কোথাও এটি আকস্মিক বন্যা তৈরি করে, কোথাও বরফ-পাথর-কাদার ভয়ংকর প্রবাহ সৃষ্টি করে। আবার বিপুল পরিমাণ পাথর ও বরফ কোনো সংকীর্ণ ফিয়র্ড বা জলাধারে আছড়ে পড়লে বিশাল ঢেউ বা মেগাসুনামিও সৃষ্টি হতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—এই দুর্যোগ কি আগে থেকে শনাক্ত করা সম্ভব? এর উত্তর একই সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’। সব হিমবাহ ধসের আগে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ের ভেতরের পরিবর্তন এত দ্রুত ঘটে যে কয়েক দিন আগেও বিপদের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে ধসের অনেক আগে থেকেই বরফের গতি বেড়ে যাওয়া, নতুন ফাটল তৈরি, ঘন ঘন পাথর পড়া, পাহাড়ের ঢালের স্থানচ্যুতি বা হিমবাহ হ্রদের পানির স্তরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো সংকেত ধরা পড়ে। স্যাটেলাইট ছবি, রাডার, জিপিএস, ড্রোন, ভূকম্পন সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র এবং নদীর পানির উচ্চতা মাপার যন্ত্র একত্রে ব্যবহার করলে এসব পরিবর্তনের অনেকটাই শনাক্ত করা সম্ভব। সুইজারল্যান্ডের ব্লাটেনের ঘটনা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০২৫ সালে আল্পসের একটি হিমবাহ ও পাহাড়ের বিপুল অংশ ধসে গ্রামটির বড় অংশ ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে। কিন্তু ঝুঁকির লক্ষণ পর্যবেক্ষণের কারণে আগেই বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে ভয়াবহ ভৌত ক্ষয়ক্ষতি হলেও বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়। হিমালয়েও একই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তবে কাজটি আল্পসের তুলনায় অনেক কঠিন। কারণ হিন্দুকুশ হিমালয় বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। দুর্গম অনেক জায়গায় সরাসরি গিয়ে যন্ত্র বসানো বা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা ব্যয়বহুল ও জটিল। এখানেই রয়েছে আরেকটি বড় সমস্যা—হিমালয়ের অধিকাংশ হিমবাহ এখনো যথেষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। আইসিমোডের ‘এইচকেএইচ গ্লেসিয়ার আউটলুক ২০২৬’ প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষিত ৩৮টি হিমবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র সাতটি বিশ্ব হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সংস্থার ‘বেঞ্চমার্ক’ মানদণ্ড পূরণ করে। অর্থাৎ কমপক্ষে ১০ বছরের ধারাবাহিক ও মানসম্মত তথ্য রয়েছে মাত্র অল্পসংখ্যক হিমবাহের। আইসিমোডও বলছে, পর্যবেক্ষণের বর্তমান নেটওয়ার্ক ভৌগোলিকভাবে অসম। কারাকোরামসহ হিমালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশে তথ্যের বড় ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিজ্ঞানীদের সামনে দ্রুত বদলে যাওয়া বিশাল একটি পর্বতব্যবস্থা রয়েছে, অথচ তার একটি বড় অংশ সম্পর্কে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের তথ্যই নেই। আইসিমোডের হিমাঞ্চল বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজমের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা ৩৮টি হিমবাহের প্রায় ৮৯ শতাংশ বছরেই বরফের ভর কমেছে। ২০০০ সালের আগে গড়ে যে হারে বরফ কমছিল, ২০০০ সালের পর সেই হার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। হিমবাহ হারানোর প্রভাব শুধু দুর্যোগে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথম দিকে অতিরিক্ত বরফ গলে নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বরফের ভান্ডার ছোট হয়ে গেলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, পানীয় জল, জলবিদ্যুৎ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং কোটি কোটি মানুষের জীবিকার ওপর। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা। হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলোর বড় অংশ এই তিন নদীব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে পাহাড়ের অনেক দূরে অবস্থিত দেশ ও জনপদও হিমবাহের পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এ কারণেই হিমালয়ের হিমবাহ সংকটকে শুধু নেপাল, ভারত, চীন, পাকিস্তান বা ভুটানের পৃথক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নদী ও হিমবাহ রাষ্ট্রীয় সীমান্ত মানে না। একটি দেশে সৃষ্ট হিমবাহ হ্রদের বন্যা বা নদীর প্রবাহের পরিবর্তন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্য দেশে পৌঁছে যেতে পারে। আগাম সতর্কতার জন্য তাই সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উজানের নদীর পানির উচ্চতা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, পাহাড়ধস বা হিমবাহ হ্রদের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের তথ্য দ্রুত ভাটির দেশে পৌঁছালে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার জন্য মূল্যবান সময় পাওয়া যেতে পারে। আইসিমোড চলতি আগস্টেও হিন্দুকুশ হিমালয়ের জন্য সমন্বিত ‘ক্রায়োস্ফিয়ার’ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, হিমবাহ দ্রুত ভর হারাচ্ছে, তুষারের ধরন বদলাচ্ছে, পারমাফ্রস্ট ক্ষয় হচ্ছে এবং নদীর প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের মতো দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। শুধু প্রযুক্তি অবশ্য যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্কবার্তা বুঝতে শেখানো, নিরাপদ আশ্রয় চিহ্নিত করা, নিয়মিত মহড়া চালানো এবং স্থানীয় মানুষের পর্যবেক্ষণকে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি। একই সঙ্গে নদীর তীর ও সম্ভাব্য বন্যাপ্রবাহের পথে অপরিকল্পিত বসতি, সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ দুর্যোগ পুরোপুরি আটকানো না গেলেও তার সামনে কত মানুষ ও কত অবকাঠামো রাখা হচ্ছে, সেটি মানুষের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করে। বিজ্ঞানীরা এখনো বলতে পারেন না, হিমালয়ের পরবর্তী বড় হিমবাহ ধসটি ঠিক কোন পাহাড়ে এবং কোন দিনে ঘটবে। কিন্তু কোন অঞ্চল তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় বরফ দ্রুত বদলাচ্ছে, কোন হিমবাহ হ্রদ বড় হচ্ছে এবং কোথায় পাহাড়ের ঢালে অস্বাভাবিক নড়াচড়া হচ্ছে—এসব চিহ্নিত করার সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। তাই লক্ষ্য এখন ভূমিকম্পের মতো কোনো ঘটনার সুনির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করা নয়; বরং বিপজ্জনক হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢাল শনাক্ত করে ঝুঁকির মাত্রা বোঝা এবং বিপদের সংকেত দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব মানুষকে সতর্ক করা। সাম্প্রতিক নেপাল-তিব্বত বিপর্যয় সেই প্রয়োজনীয়তাকেই আরও প্রকট করেছে। ২০০০ সালের পর হিমালয়ে বরফ ক্ষয়ের হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়া শুধু কোনো বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পাহাড়, নদী এবং কয়েক শ কোটি মানুষের পানি ও জীবিকার ভবিষ্যৎ। পরবর্তী বড় বিপর্যয় কোথায় ঘটবে, সেটি হয়তো আজই বলা সম্ভব নয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—হিমালয়ের বরফ দ্রুত বদলাচ্ছে, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা বদলাচ্ছে এবং অতীতের তথ্য দিয়ে ভবিষ্যতের ঝুঁকি বিচার করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি তাই শুধু ‘পরের বিপর্যয় কি আঁচ করা সম্ভব’ নয়। বড় প্রশ্ন হলো—যে সংকেতগুলো ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীরা পাচ্ছেন, সেগুলো কাজে লাগিয়ে বিপর্যয়ের আগেই মানুষকে নিরাপদে সরানোর মতো প্রস্তুতি হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলো কত দ্রুত নিতে পারবে।