বছর চারেক আগেও চিত্রনায়িকা পরীমনির জন্মদিন মানেই ছিল জমকালো আয়োজন। পাঁচতারা হোটেলের ঝলমলে পরিবেশ, বর্ণিল থিম, বিশেষ পোশাক, কেক কাটা আর তারকাদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে উঠত পুরো আয়োজন। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। ২০২৩ সালে প্রিয় নানাকে হারানোর পর থেকে আর আগের মতো করে জন্মদিন উদ্যাপন করেননি এই অভিনেত্রী। এবারও বড় আয়োজনের বদলে কাছের মানুষদের নিয়ে ছোট পরিসরে একটি সন্ধ্যা কাটানোর কথা ভাবছেন তিনি। ১৯৯২ সালের ২৪ অক্টোবর সাতক্ষীরায় জন্ম পরীমনির। তাঁর জন্মনাম শামসুন্নাহার স্মৃতি। শৈশব কেটেছে পিরোজপুরের শঙ্করপাশা গ্রামে। মাত্র তিন বছর বয়সে মাকে হারান তিনি। পরে বাবা মনিরুল ইসলাম তাঁকে পিরোজপুরে নানাবাড়িতে রেখে আসেন। সেখানেই নানা শামসুল হক গাজীর স্নেহে বেড়ে ওঠেন ভবিষ্যতের এই চলচ্চিত্র তারকা। শৈশব থেকে জীবনের নানা পর্যায়ে নানাই ছিলেন পরীমনির সবচেয়ে কাছের মানুষ। তাঁর জীবনে নানার ভূমিকা ছিল অভিভাবকের পাশাপাশি বন্ধুরও। তাই ২০২৩ সালে নানাকে হারানোর পর জন্মদিন উদ্যাপনের আনন্দও যেন অন্য রকম হয়ে যায়। প্রিয় মানুষটিকে ছাড়া আগের মতো উৎসব করার কথা ভাবতেই পারেননি তিনি। এ প্রসঙ্গে পরীমনি বলেন, ‘নানু ভাই যাওয়ার পরে আসলে আমি বার্থডে কখনো সেলিব্রেটই করি নাই। আমার মাথায় আসে নাই যে আমি নানু ভাইকে ছাড়া কেক কাটবো, সবাইকে নিয়ে হইচই করবো সেটা আমার মাথায় আসে নাই একদমই।’ তবে এবার কাছের মানুষদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী। তাঁর ভাষায়, ‘কিন্তু আমার মনে হয় একটু সবাই একসাথে একটা সন্ধ্যা... আপনারা যারা আছেন, আমার কাছের প্রিয় মানুষজন, তাদেরকে নিয়ে একটুখানি একটা সন্ধ্যা তো কাটাতেই পারি।’ পরীমনির জন্মদিন ঘিরে একসময় ভক্ত ও বিনোদনজগতের মানুষের মধ্যে তৈরি হতো বাড়তি আগ্রহ। প্রতিবছর আয়োজনের সাজসজ্জা, পোশাক ও অতিথিদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলত। তবে নানার মৃত্যুর পর সেই জাঁকজমক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। এবারও তাঁর কথায় বড় আয়োজনের চেয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গেই সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা বেশি স্পষ্ট। অভিনেত্রী হিসেবে পরীমনির পথচলাও ছিল স্বপ্ন আর নানা অভিজ্ঞতায় ভরা। নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টসে (বাফা) নাচ শিখতে ভর্তি হন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচের পাশাপাশি সুযোগ পান টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের। ‘সেকেন্ড ইনিংস’, ‘এক্সক্লুসিভ’ ও ‘এক্সট্রা ব্যাচেলর’-এর মতো নাটকে অভিনয় করেন তিনি। পরে ‘নারী ও নবনীতা তোমার জন্য’ নাটকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। ২০১৫ সালে চলচ্চিত্রে নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় পরীমনির। নজরুল ইসলাম খানের পরিচালনায় ‘রানা প্লাজা’ সিনেমায় অভিনয় করলেও নানা জটিলতায় ছবিটির মুক্তি আটকে যায়। পরে শাহ আলম মণ্ডল পরিচালিত ‘ভালোবাসা সীমাহীন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। রোমান্টিক চরিত্রে সহজ-সাবলীল অভিনয় দিয়ে শুরুতেই দর্শকের নজর কাড়েন পরীমনি। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে একসঙ্গে প্রায় দুই ডজন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। যদিও সেসব সিনেমার অনেকগুলো শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়নি, আবার কিছু নির্মিত হলেও মুক্তি পায়নি। সময়ের সঙ্গে অভিনয়ে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছেন এই অভিনেত্রী। ‘রূপবান’ সিনেমায় গ্রামীণ তরুণীর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে গ্ল্যামারের বাইরেও নিজের সংবেদনশীল অভিনয়ক্ষমতা তুলে ধরেন। গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘স্বপ্নজাল’ সিনেমায় রূপা চরিত্রে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। ‘বিশ্বসুন্দরী’ সিনেমায় তৃষ্ণা এবং ‘গুণিন’-এ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করেন পরীমনি। আর ‘মা’ সিনেমায় সন্তান হারানো এক মায়ের যন্ত্রণা, মাতৃত্ব ও সংগ্রামের আবেগ ফুটিয়ে তুলে অভিনয়জীবনে যোগ করেন ভিন্ন মাত্রা। পর্দায় নানা চরিত্রে নিজেকে তুলে ধরা পরীমনির ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। একসময় জন্মদিনের রাজকীয় আয়োজন ছিল তাঁর পরিচিতির অংশ। এখন সেই দিনটি ঘিরে ভাবনা অনেক বেশি ব্যক্তিগত। প্রিয় নানার স্মৃতি আর কাছের মানুষদের সঙ্গ—এ দুটিই যেন এবার তাঁর জন্মদিনের মূল অনুষঙ্গ।