প্রকাশ :: ... | ... | ...

চরিত্রের ভেতর দিয়ে মানুষের জীবন অনুভব করতে চান রুনা খান


সংযুক্ত ছবি

মঞ্চ থেকে ওটিটি—চরিত্রের বৈচিত্র্যেই অভিনয়ের আনন্দ খুঁজে পান অভিনেত্রী একজন অভিনেত্রীর কাছে চরিত্র শুধু কিছু সংলাপ, পোশাক আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর নাম নয়। প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জীবন—তার নিজস্ব গল্প, সংকট, আনন্দ-বেদনা ও যাপনের ধরন। সেই জীবনকে বোঝার চেষ্টা করাই রুনা খানের অভিনয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ। পর্দায় নিজেকে দেখানোর চেয়ে চরিত্রের মানুষটিকে তুলে ধরতেই যেন বেশি আগ্রহী তিনি। কখনো প্রান্তিক এক নারী, কখনো উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি। কখনো খুব পরিচিত কোনো মানুষ, আবার কখনো সম্পূর্ণ অচেনা এক জীবন। চরিত্র বদলায়, বদলায় মানুষের গল্প। আর সেই গল্পের ভেতর দিয়ে অভিনয়ের নতুন পথ খুঁজে নেন রুনা খান। ২০০১ সালে পথনাটকের মাধ্যমে অভিনয়ে হাতেখড়ি তাঁর। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে একটি পথনাটকের প্রদর্শনীর মাত্র সপ্তাহখানেক আগে দলে যোগ দিয়েছিলেন এক কিশোরী। এরই মধ্যে দলের এক সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়ায় তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। অভিজ্ঞ সেই সদস্যের অনুপস্থিতিতে নতুন মেয়েটিকেই মঞ্চে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। হাজারো দর্শকের সামনে শুরুতে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত নিজেকে প্রমাণ করেন রুনা। প্রদর্শনী শেষে দর্শকের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে মঞ্চ। সেই অভিজ্ঞতা হয়তো তাঁকে প্রথমবারের মতো বুঝিয়েছিল, একটি চরিত্রে ঢুকে পড়া মানে অন্য একটি জীবনকে কিছু সময়ের জন্য নিজের ভেতর ধারণ করা। এরপর ২০০৪ সালে ‘সিসিমপুর’ দিয়ে শুরু হয় তাঁর পেশাদার অভিনয়জীবন। মঞ্চ, টেলিভিশন ও সিনেমা পেরিয়ে পরে ওটিটিতেও নিজের অভিনয়দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। পেয়েছেন জাতীয় স্বীকৃতিও। অভিনয়জীবনের শুরুর সময়টায় নিয়মিত কাজ করেছেন রুনা। ২০০৯ সালে বিয়ের আগ পর্যন্ত একের পর এক নাটকে অভিনয় করেছেন। তখন তাঁর ভাবনাটা ছিল সহজ—যত বেশি কাজ করবেন, তত বেশি পর্দায় দেখা যাবে, মানুষ তাঁকে চিনবে। একক নাটক থেকে ধারাবাহিক—সব মাধ্যমেই ছিল তাঁর উপস্থিতি। এরপর মাতৃত্বের কারণে প্রায় তিন বছরের বিরতি। অভিনয়জীবনে সেই বিরতি এক ধরনের ছেদ তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুনভাবে ভাবতে শেখায় তাঁকে। পরিবার ও সন্তানকে বেশি সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রুনা। ফলে নিয়মিত ধারাবাহিকের বদলে একক নাটক, টেলিছবি ও সিনেমার দিকে ঝুঁকে পড়েন। কাজের পরিমাণের চেয়ে চরিত্রের গুরুত্ব তাঁর কাছে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে। সিনেমায় তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘ছিটকিনি’ ও ‘হালদা’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রই হয়ে ওঠে রুনার অভিনয়জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। চরিত্রের আকার কিংবা পর্দায় উপস্থিতির সময়ের চেয়ে চরিত্রটি তাঁকে কতটা নতুন কিছু করার সুযোগ দিচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁর কাছে। মাসে চার-পাঁচ দিন, এমনকি দুই মাস পরপর শুটিং—এভাবেই নিজের কাজের ছন্দ তৈরি করেছেন তিনি। দেশে ওটিটির যাত্রা শুরু হওয়ার পর রুনার সামনে খুলে যায় আরও বৈচিত্র্যময় চরিত্রের দরজা। ‘আন্তঃনগর’-এর রোজিনা, ‘অসময়’-এর এমিলি রহমান, ‘বোধ’-এর দীপ্তি, ‘বোহিমিয়ান ঘোড়া’সহ বিভিন্ন ওয়েব কনটেন্টে নিজেকে নতুন করে তুলে ধরেছেন তিনি। এর মধ্যে কাজল আরেফিন অমির ‘অসময়’-এ এমিলি রহমান চরিত্রটি তাঁর অভিনয়জীবনে আলাদা করে আলোচিত হয়েছে। সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত নারীর একটি ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন তিনি এ চরিত্রের মাধ্যমে। রুনা খান বলেন, “জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমা আমি দেখতেও পছন্দ করি, নিজেও অভিনয় করতে পছন্দ করি। আমার কাছে অভিনয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হলো মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখা। একটি চরিত্রের ভেতর দিয়ে অন্য একজন মানুষের জীবনকে অনুভব করার সুযোগ পাওয়া যায়।” তাঁর অভিনীত সিনেমাগুলোর দিকেও তাকালে এই দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়। কৌশিক শংকর দাসের ‘দাফন’, মাসুদ পথিকের ‘বক’, জাহিদ হোসেনের ‘লীলা মন্থন’, সন্দীপ বিশ্বাসের ‘অসীমের পানে’ এবং রাজন তালুকদারের ‘জলপবন’—বিভিন্ন কাজেই চরিত্রের বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ‘জলপবন’-এর শুটিং হয়েছে হাওর অঞ্চলে। ‘বক’ নির্মিত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার ছায়া অবলম্বনে। রুনার কাছে এসব কাজ শুধু সিনেমা নয়; দেশের সাধারণ মানুষ, প্রান্তিক মানুষ ও নারীর জীবনের নানা গল্পও। প্রতিটি চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর কাছে অভিনয়ের আনন্দও সেখানেই। রুনা বলেন, “আমি একই স্বাদের চরিত্রে অভিনয় করতে চাই না। একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়া। কখনো এমন একজন নারীর চরিত্র করছি, যার জীবন আমার চারপাশের মানুষের জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আবার কখনো এমন কাউকে করছি, যাকে হয়তো আমরা প্রতিদিন দেখি, কিন্তু তার ভেতরের গল্পটা জানি না। সেই গল্পটা খুঁজে বের করার জায়গাটা আমার কাছে অভিনয়।” এত কাজের পরও অভিনয়কে অর্থনৈতিক নির্ভরতার জায়গা হিসেবে দেখেন না রুনা। তাঁর কাছে অভিনয় মূলত ভালোবাসার জায়গা। সম্ভবত সে কারণেই কাজের সংখ্যা নয়, চরিত্রের প্রতি আকর্ষণই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “অভিনয় আমার কাছে ভালোবাসার জায়গা। আমি এটিকে কখনো শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখিনি। হয়তো সে কারণে কাজ কম হলেও আমি এমন কিছু করতে চাই, যেটি করার পর মনে হবে সময়টা সার্থক হয়েছে।” অবশ্য একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজের পছন্দের সব চরিত্র সব সময় বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রযোজক বা পরিচালক না হলে গল্প কিংবা চরিত্র নির্ধারণে অভিনয়শিল্পীর ক্ষমতাও সীমিত। তাই যে কাজের প্রস্তাব আসে, সেখান থেকেই নিজের পছন্দের চরিত্রটি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন রুনা। তাঁর ভাষায়, “একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর হাতে সব সময় চরিত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। আমাদের কাছে যে কাজ আসে, সেখান থেকে বেছে নিতে হয়। তাই যারা আমাকে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে ভেবেছেন, তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।” মঞ্চের সেই প্রথম দিন থেকে আজকের ওটিটির পর্দা—রুনা খানের অভিনয়যাত্রা তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর ক্যারিয়ারের গল্প নয়। এটি চরিত্রের ভেতর দিয়ে নানা মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে দেখার গল্প। কখনো তিনি প্রান্তিক এক নারী, কখনো উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি; কখনো খুব পরিচিত কোনো মানুষ, আবার কখনো সম্পূর্ণ অচেনা এক জীবন। চরিত্র বদলায়, গল্প বদলায়, কিন্তু অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ একই থাকে। অভিনয়ের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ফ্যাশন ও নিজের উপস্থাপন নিয়েও আলোচনায় রয়েছেন রুনা। ৪১ বছর বয়সেও নিজের উপস্থিতি ও ফ্যাশনবোধ দিয়ে ভক্তদের নজর কাড়ছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিভিন্ন ফ্যাশন ফটোশুট নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। সম্প্রতি সাদা-কালো গাউনে ফটোশুটে দেখা গেছে তাঁকে। বিভিন্ন পোজে তোলা ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর অনুসারীদের মধ্যে সাড়া পড়ে। নিজের বয়স ও চেহারার প্রসঙ্গে রুনা খান বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক তারকাদের উদাহরণও টেনেছেন। তিনি বলেন, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, ক্যাটরিনা কাইফ ও দীপিকা পাড়ুকোনের মতো অভিনেত্রীরা বয়সের সঙ্গে নিজেদের উপস্থাপনায়ও পরিবর্তন এনেছেন। বাংলাদেশের বাঁধন ও রুনা খানও ৪০ পেরিয়েছেন। তাঁদের মতো করে কাজ ও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন কিছু করার ভাবনাও তাঁর রয়েছে। এর আগে রাজধানীতে ‘খাদি ফ্যাশন উইক’-এ প্রথমবারের মতো র‌্যাম্পে হাঁটেন রুনা খান। অনুষ্ঠানে শো-স্টপার হিসেবে অংশ নেন তিনি। তাঁর পোশাকেও ছিল ভিন্নতার ছাপ—উজ্জ্বল নীল শাড়ির সঙ্গে পরেছিলেন একই রঙের স্টাইলিশ জ্যাকেট। তবে পর্দা হোক কিংবা র‌্যাম্প—নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেয়ে রুনার কাছে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে চরিত্র ও গল্প। কারণ তাঁর কাছে অভিনয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অন্য একজন মানুষের জীবনকে নিজের ভেতর দিয়ে অনুভব করা। **ট্যাগ:** রুনা খান, রুনা খান অভিনয়, রুনা খানের সিনেমা, রুনা খানের নাটক, রুনা খান ওটিটি, রুনা খান ফ্যাশন, রুনা খান র‌্যাম্প, সিসিমপুর, ছিটকিনি, হালদা, দাফন, বক, লীলা মন্থন, অসীমের পানে, জলপবন, আন্তঃনগর, অসময়, বোধ, বোহিমিয়ান ঘোড়া, বাংলাদেশি অভিনেত্রী, বাংলা সিনেমা, বাংলা নাটক, ওটিটি