দিনাজপুরে বাণিজ্যিকভাবে গাছ আলু চাষ করে সফলতা পাচ্ছেন কৃষকেরা। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পরীক্ষামূলক ও বাণিজ্যিকভাবে এ আলুর চাষ হচ্ছে। ইতোমধ্যে কোনো কোনো গাছের আলুর ওজন ৭ থেকে ৮ কেজি হয়েছে। কম খরচে ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকায় এ ফসল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আফজাল হোসেন বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গাছ আলুর বীজ সংগ্রহ করে বিরগঞ্জ, কাহারোল, খানসামা, চিরিরবন্দর, বিরল, বোচাগঞ্জ, পার্বতীপুর, ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর, বিরামপুর ও ঘোড়াঘাট উপজেলায় রোপণ করা হয়েছে। খানসামা উপজেলার খামারপাড়া গ্রামের কৃষক আসাদুজ্জামান ও টংগুয়া গ্রামের কৃষক খয়রাত আলীকে তাঁদের জমিতে চাষের জন্য গাছ আলুর বীজ দেওয়া হয়। বিলুপ্তপ্রায় এ আলুর চাষের জন্য জমিতে জৈব ও গোবর সার দিয়ে প্রস্তুত করে বীজ রোপণ করা হয়। আড়াই মাসের মধ্যে গাছ বেড়ে ওঠার পাশাপাশি আলু ধরতে শুরু করেছে। কোনো কোনো আলুর ওজন ৭ থেকে ৮ কেজি হয়েছে। কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, সময়ের সঙ্গে কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার প্রভাবে জমির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে গ্রামাঞ্চলে বাড়ির আঙিনা ও ঘরের আশপাশের ঝোপঝাড় কমে গেছে। একসময় এসব স্থানে প্রাকৃতিকভাবে গাছ আলু জন্মাত। কিন্তু ঝোপঝাড় ও অনাবাদি জায়গা কমে যাওয়ায় পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এ আলু ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। কৃষি বিভাগের উদ্যোগে গবেষণা ও চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আবারও গাছ আলুর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এরই অংশ হিসেবে কৃষিপ্রধান দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতা ও পরামর্শে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে গাছ আলুর চাষ করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত গাছ আলুর একেকটির ওজন ৭ থেকে ৮ কেজি হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কন্দাল ফসল উন্নয়ন প্রকল্পের সহায়তায় চলতি মৌসুমে দিনাজপুরে ২০ একর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে গাছ আলুর চাষ করেছেন কৃষকেরা। এ ছাড়া অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও ছোট পরিসরে এ আলুর চাষ শুরু করেছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, খানসামা উপজেলার খামারপাড়া ও টংগুয়া গ্রামে কৃষি বিভাগের সহায়তায় স্থানীয় জাতের গাছ আলুর চাষ করেছেন কৃষকেরা। ২০ শতক জমিতে প্রায় দুই টন ফলনের আশা করছেন তাঁরা। বর্তমানে প্রতি কেজি গাছ আলুর বাজারমূল্য প্রায় ৩০ টাকা। কম খরচে ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকায় খুশি কৃষকেরা। গাছ আলু দিয়ে আলু ও গোল আলুর মতো ভর্তা তৈরি করা যায়। এ ছাড়া মাছ ও মাংসের সঙ্গে রান্না করেও খাওয়া যায়। আলুটি সুস্বাদু ও মুখরোচক হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। গাছ আলুচাষি খয়রাত আলী বলেন, কম খরচে বেশি লাভের আশায় কৃষি বিভাগের অনুপ্রেরণায় ২০ শতক জমিতে গাছ আলুর চাষ করেছেন তিনি। এ ফসল উৎপাদনে তাঁর খরচ হবে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। তিনি দুই টনের বেশি ফলন পাওয়ার আশা করছেন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা। খামারপাড়া গ্রামের কৃষক আসাদুজ্জামান বলেন, অন্য ফসলের তুলনায় গাছ আলু চাষে লাভ বেশি। স্থানীয় বাজারসহ অন্যান্য এলাকায় এ আলুর চাহিদা থাকায় অনেকেই এর চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক গাছ আলু চাষের সফলতায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, জেলার সব উপজেলায় স্বল্প খরচে গাছ আলুর চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় সবজির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায়ও সরবরাহ করা সম্ভব হবে। কৃষি বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী, গাছ আলু বিষমুক্ত, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে পরিচিত। বীজ রোপণের দেড় মাস পর থেকেই গাছে আলু ধরতে শুরু করে। কম খরচে এ ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক হতে পারে। বিলুপ্তপ্রায় গাছ আলুর চাষ আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠলে মানুষের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি সবজির চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখবে।