প্রকাশ :: ... | ... | ...

ইউপি নির্বাচনে জামানত বাড়ছে পাঁচ গুণ, ব্যয়সীমা দ্বিগুণ


সংযুক্ত ছবি

চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ২৫ হাজার, সদস্যের ৫ হাজার টাকা; ১৫ শতাংশ ভোট না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের বিধিমালায় বেশ কিছু কঠোরতা আনছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত পাঁচ গুণ এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীর জামানতও পাঁচ গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়সীমা দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জামানত ফেরত পাওয়ার শর্তও কঠোর হচ্ছে। মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ না পেলে প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। বর্তমান বিধিতে এই সীমা মোট প্রদত্ত ভোটের এক-অষ্টমাংশ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীর ব্যয়সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইসি সূত্রের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবার নির্দলীয় ও প্রতীকবিহীন হওয়ায় বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রার্থী বেশি হলে ব্যালটে নামের সংখ্যা বাড়বে, পাশাপাশি প্রার্থী, এজেন্ট ও কর্মী-সমর্থকদের কারণে নির্বাচন পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তবে জামানত পাঁচ গুণ বাড়ানোর প্রভাব নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল আলীম মনে করেন, এতে প্রার্থী সংখ্যা কমার পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে কম সক্ষম কিন্তু যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাঁর মতে, জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর কারণে অনেকে প্রার্থী হতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। তবে তাঁর মতে, জামানত বাড়ানোর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করানো এবং তাদের মাধ্যমে অতিরিক্ত এজেন্ট নিয়োগ করে ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা থাকে। জামানতের পরিমাণ বাড়লে এ ধরনের প্রবণতা কমতে পারে। নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন আবদুল আলীম। তবে প্রার্থীরা যাতে নির্ধারিত সীমার মধ্যেই ব্যয় করেন, তা নিশ্চিত করতে ইসিকে কঠোর নজরদারি করতে হবে বলেও তিনি মনে করেন। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ অবশ্য জামানত বাড়ানোর কারণে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে ২৫ হাজার টাকা জামানত খুব বেশি নয়। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত আগে থেকেই ২৫ হাজার টাকা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সঙ্গে সমন্বয় করতেই ইউপি নির্বাচনে জামানত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচনী ব্যয়সীমাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালায় প্রার্থীদের হলফনামায় আরও কিছু তথ্য যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। হলফনামায় নতুন তথ্য দিতে হবে এবং অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে। একক প্রার্থী থাকলে আগের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার বিধান বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনরত কোনো ব্যক্তিকে হুমকি, ভয় দেখানো বা আঘাত করা কিংবা ভোটারকে ভোট দিতে বাধা দেওয়ার মতো অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তা বা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনী অপরাধের শাস্তিও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বিধানে নির্বাচনী অপরাধে ন্যূনতম ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে নির্বাচন বন্ধ বা বাতিল করার ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো প্রার্থীর এজেন্ট না থাকলেও নির্বাচন বৈধ বলে গণ্য হবে—এমন বিধানও যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। নির্বাচনী প্রতীকেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউপি নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনী ইতিমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ করে নির্বাচন কমিশনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তী ধাপে এসআরও নম্বর দেওয়ার জন্য এটি আবার আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সংশোধিত বিধিমালা কার্যকর হওয়ার কথা। স্থানীয় সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠান—উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের নির্বাচন বিধিমালাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুলোর সংশোধনীও আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।