প্রকাশ :: ... | ... | ...

দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধ, বিতর্কিত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিএনপির কঠোর অবস্থান


সংযুক্ত ছবি

চাঁদাবাজি-দখল-সহিংসতার অভিযোগ যাচাইয়ে নজরদারি বাড়ছে; পদ-পদবি বিবেচনা না করে সাংগঠনিক ব্যবস্থার কথা নেতাদের দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, জমি দখল, ভাঙচুর, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে বিএনপি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দলীয় পদ বা প্রভাব বিবেচনা না করে বহিষ্কার, পদ স্থগিত, অব্যাহতি কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপের পক্ষেও অবস্থান জানিয়েছে দলটি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৃণমূল থেকে অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বারবার চাঁদাবাজি, জমি দখল, সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এসেছে, তাদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, চাঁদাবাজি, টোল আদায় ও জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্সও একই ধরনের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, যথাযথ তদন্তের পর কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে কেউ দলের নাম ব্যবহার করতে পারবেন না।’ চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক, বেআইনি, সহিংস বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়েও রিজভী জানিয়েছিলেন, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নাম ব্যবহার করে দুর্বৃত্তচক্র গড়ে তোলা বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। তখন তাঁর দেওয়া হিসাবে, কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। দলটির এই অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগের সাম্প্রতিক উদাহরণও রয়েছে। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা মা ও শিশুস্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ ওঠার পর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি; বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও সংগঠনবিরোধী আচরণের কথা বলা হয়েছে। রাড্ডার ঘটনার পর বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। একই সময়ে রাজধানীর ইসিবি এলাকায় কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাতেও স্থানীয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে। তবে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে ঘটনাটিকে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ওই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে এ ঘটনায় কারা কোন রাজনৈতিক সংগঠনের হয়ে বা কী উদ্দেশ্যে জড়িত ছিল—তা তদন্তের বিষয়। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। অভিযোগের ধরন, প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা এবং ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করেই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রেও দল রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবিলা করবে বলে নেতারা জানিয়েছেন। এই দ্বৈত অবস্থানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে দলটির নেতারা বলছেন, একদিকে দলের পরিচয় ব্যবহার করে প্রকৃত অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ উঠলে সেটিও যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা যাবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগের বিষয়ে কথা বলেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, বিএনপির প্রকৃত নেতাকর্মীদের কেউ চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নন এবং দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হলে তারও মোকাবিলা করা প্রয়োজন। তবে বিএনপির সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নতুন নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা দলটি বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দলীয় দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, ওই সময় থেকে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল; এর মধ্যে দুই হাজার ছয়শর বেশি নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। একই সঙ্গে এসব শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের কিছু পরে প্রত্যাহারও করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিএনপি ২০ নেতার বহিষ্কার, পদ স্থগিত ও অব্যাহতির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছিল। এতে বোঝা যায়, সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ রাখা হচ্ছে। দলের তৃণমূলের একটি অংশ অবশ্য আরও কঠোর সাংগঠনিক শুদ্ধি কার্যক্রমের দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে দলের আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে দলের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থে প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া ব্যক্তিদের এক করে দেখা উচিত নয়। বিশেষ করে ‘নতুন বিএনপি’ বা ‘হাইব্রিড’ পরিচয়ে দলে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অতীত যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তৃণমূলের নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, দলের কোনো কমিটিতে দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা, স্থানীয় পর্যায়ে ভূমিকা এবং জনগণের সঙ্গে তাঁর আচরণ যাচাই করা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও দলীয় শৃঙ্খলা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। সরকারের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে আলাদা গুরুত্ব তৈরি করেছে। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। তিনি বলেন, ‘অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কোনো বিবেচনায় নেওয়া হবে না।’ একই ঘটনায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন। ফলে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ—দুটি প্রক্রিয়াই এখন আলাদা পথে এগোচ্ছে। দলীয়ভাবে কারও বিরুদ্ধে বহিষ্কার বা পদ স্থগিত করা হলে সেটি রাজনৈতিক-সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত; আর কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে আইনগত দায় নির্ধারণ করবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো—দলের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থে চাঁদাবাজি, দখল, সহিংসতা বা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলে তা আর শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা হিসেবে এড়িয়ে যেতে চাইছে না দলটি। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কাউকে দায়ী না করার কথাও বলছে। আগামী দিনে এই অবস্থান কতটা কার্যকরভাবে তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হয়, সেটিই হবে মূল বিষয়। কারণ বড় রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় হুঁশিয়ারির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ গ্রহণ, যাচাই, সাংগঠনিক তদন্ত এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য দেওয়ার প্রক্রিয়া কার্যকর না হলে শুধু ঘোষণা দিয়ে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা কঠিন। বিএনপির সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো তাই দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণেরও একটি পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।