আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁদের একজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) থেকে উত্তর সিটি করপোরেশনে, অন্যজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) থেকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ভোটার এলাকা স্থানান্তর করেছেন। এনসিপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও দলটির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দলের এই দুই শীর্ষ নেতা ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। আসিফ মাহমুদ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ভোটার ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আফতাবনগর এলাকায় নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উত্তরা এলাকার ভোটার ছিলেন। তিনি এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ঢাকা-৮ সংসদীয় আস এলাকার ভোটার হয়েছেন। সোমবার সন্ধ্যায় এনসিপির পক্ষ থেকে দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টি জানানো হয়। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্ধারিত ফরম-১৩–এর মাধ্যমে তাঁরা ভোটার এলাকা পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেছিলেন। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও দাপ্তরিক নথিপত্র পরীক্ষা শেষে ইসি তাঁদের আবেদন অনুমোদন করেছে। এনসিপির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সঙ্গে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাঁদের প্রার্থিতার বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আগে থেকেই ঢাকায় নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ভবিষ্যতেও ঢাকায় নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সারোয়ার তুষারের ভাষায়, ‘নাসির (নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী) তো ঢাকা থেকে ইলেকশন করেছে, ভবিষ্যতে (সিটি করপোরেশন নির্বাচন) এখান থেকেই করবে।’ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ফলে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ঢাকা-৮ এলাকার ভোটার করা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন দলটির নেতারা। অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের রাজনীতিতে তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আফতাবনগর এলাকায় তাঁর ভোটার নিবন্ধন ভবিষ্যৎ সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতির অংশ বলেই দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এনসিপির এই দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এল, যখন দলটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই ও বিস্তারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে নতুন দলটি এর আগে জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা নিজেদের সাংগঠনিক কৌশল অনুযায়ী প্রার্থী দেবে। এনসিপি বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার কাঠামোর মধ্যে থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলটির অবস্থান আলাদা। স্থানীয় নির্বাচনে জোটগত সিদ্ধান্তের বদলে নিজস্ব কৌশলে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন দলটির নেতারা। দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের কারণে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক সমঝোতায় কোনো প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সারোয়ার তুষার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আগে থেকেই দুই দলের আলাদা অবস্থান রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি এনসিপির নিজস্ব নির্বাচনী কৌশলের অংশ। সারোয়ার তুষার বলেন, ‘না, আমাদের তো জোটে আগে থেকেই বলা আছে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমরা আমাদের মতো করে করব; যার যার মতো হবে। সেটা আমাদের নিজস্ব কৌশল হিসেবে আমরা এখন দুইজনকে দুই জায়গায় স্থানান্তরিত করলাম।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন এনসিপির জন্য তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগর এলাকায় দলের পরিচিত মুখদের প্রার্থী করা হলে তা দলটির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটের সক্ষমতা যাচাইয়ের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী—দুজনই এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তাঁদের মধ্যে আসিফ মাহমুদ দলটির মুখপাত্র হিসেবে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দলটির মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে সংগঠন ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাঁদের ভোটার এলাকা পরিবর্তনকে কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা; বরং এটিকে সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করলেই কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিশ্চিত হয় না। সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, প্রার্থিতা জমা, যাচাই-বাছাইসহ নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। দলীয় মনোনয়ন বা প্রার্থী হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভোটার তাঁর বর্তমান ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় যেতে চাইলে নির্ধারিত ফরম-১৩–এর মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন। আবেদনের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেয়। আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে এনসিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এদিকে ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের রাজনীতিতে সম্ভাব্য নতুন সমীকরণ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, পুরোনো দলগুলোর সাংগঠনিক অবস্থান এবং স্থানীয় পর্যায়ে ভোটের হিসাব—সব মিলিয়ে রাজধানীর সিটি নির্বাচন আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আসিফ মাহমুদের উত্তর সিটিতে এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর দক্ষিণ সিটিতে ভোটার হওয়া তাই এনসিপির জন্য শুধু ভোটার তালিকার পরিবর্তন নয়, সম্ভাব্য নগর নির্বাচনের মাঠে দলের কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণেরও একটি বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্যাগ: আসিফ মাহমুদ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপি, ভোটার এলাকা পরিবর্তন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন, ঢাকা-৮, আফতাবনগর, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নির্বাচন, আসিফ মাহমুদ নির্বাচন