প্রকাশ :: ... | ... | ...

রাড্ডা সেন্টারে হামলার পর তিন কমিটি বিলুপ্ত, বিএনপি-অঙ্গসংগঠনের ১৪ নেতা বহিষ্কার


সংযুক্ত ছবি

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, উত্তর যুবদল ও পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বাতিল; সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাড্ডা সেন্টারে হামলার সরাসরি যোগসূত্রের কথা বিজ্ঞপ্তিতে নেই রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় আসার কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ তিনটি কমিটি বিলুপ্ত করেছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। একই সঙ্গে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে কমিটি বিলুপ্তি ও বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিগুলোতে রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনাকে সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিলুপ্ত কমিটিগুলো হলো ৫১ সদস্যের ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদল। বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কমিটি শিগগির ঘোষণা করার কথা বলা হলেও মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনীর হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমিনুল ইসলামকে আহ্বায়ক ও মো. মোস্তফা জামানকে সদস্যসচিব করে গঠিত ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বিদ্যমান আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে দলটির তিন নেতাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। বহিষ্কৃত তিন নেতা হলেন শাহআলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, 'সি' ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্কু। তাঁদের বিরুদ্ধে অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি। যুবদলের কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বে থাকা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। একইভাবে মেয়াদ শেষ হওয়ায় ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করেছে সংগঠনটি। শিগগির নতুন কমিটি ঘোষণার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগে ছাত্রদলের পাঁচ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরা হলেন ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহসভাপতি সারোয়ার আলম পিয়াস, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম জিন্নাহ, দারুসসালাম থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন দিপু, সদস্যসচিব ওমর নাইম এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্যসচিব শান্ত রহমান। ছাত্রদলের বিজ্ঞপ্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার কথা বলা হলেও অভিযোগগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের দারুসসালাম থানা শাখার দুই নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন শাখার আহ্বায়ক মো. আক্তার হোসেন মামুন ও সদস্যসচিব মো. হাফিজুর রহমান। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। বহিষ্কৃত দুই নেতার সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক যোগাযোগ না রাখতেও নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চার নেতাকে সব সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন শাহআলী থানা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন, শাহআলী থানা অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, সদস্য হুজাইফা এবং দারুসসালাম থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক গোলাম রসুল পারভেজ। শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান নাসিম বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। এ হিসাবে বিএনপির তিন, ছাত্রদলের পাঁচ, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই এবং শ্রমিক দলের চার নেতাসহ মোট ১৪ জনকে বহিষ্কারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগের দিন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির পল্লবী থানাধীন ৯১ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সভাপতি মফিজুর রহমান মামুনকেও দল থেকে বহিষ্কারের কথা জানায় বিএনপি। তাঁর বিরুদ্ধে অনৈতিক ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মামুনের বিরুদ্ধে তাঁর ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমানের মাধ্যমে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় একটি অপরাধী চক্র পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় চাঁদাবাজি, গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে চক্রটির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত নয়। রাড্ডা সেন্টারে হামলার প্রেক্ষাপট গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুর-১ নম্বরে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা কেন্দ্রটির নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ভবনের অংশবিশেষ ভেঙে ফেলে বলে অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ, টিকা, আসবাব ও অফিসের বিভিন্ন সরঞ্জাম লুটের অভিযোগও করা হয়। ঘটনাটি তদন্তে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার নাম উঠে এসেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তবে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের সবার সম্পৃক্ততা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। রাড্ডা সেন্টারে হামলার কয়েক দিনের মধ্যে একযোগে তিনটি কমিটি বিলুপ্তি ও ১৪ নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আসায় ঘটনাগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডা সেন্টারের নাম না থাকা এবং যুবদল ও ছাত্রদলের ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণতার কারণ উল্লেখ করায় এসব সিদ্ধান্তকে সরাসরি ওই হামলার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সাংগঠনিক সিদ্ধান্তগুলোর আনুষ্ঠানিক কারণ এবং রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তের অগ্রগতি—দুটি বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি হামলার ঘটনায় কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।