প্রকাশ :: ... | ... | ...

‘আমার স্বামী আমার কাছে সুপারম্যান ছিলেন, সুপারহিরো হয়ে থাকবেন’


সংযুক্ত ছবি

‘আমার স্বামী আমার কাছে সুপারম্যান ছিলেন। তাঁকে কে কীভাবে মূল্যায়ন করত, তা জানি না। তবে তিনি আমার কাছে সব সময়ই সুপারহিরো হয়ে থাকবেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তাঁর স্মৃতি কখনো ভুলতে পারব না।’ স্বামী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। গত বৃহস্পতিবার রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন আলিফ। স্বামীকে হারিয়ে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে আনন্দিতা। বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন আলিফ। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতে গিয়ে অনেকের বিরাগভাজন হয়েছিলেন তিনি। আলিফ কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়ার পর দুর্গাপুরে আদিবাসী নারী আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করে সেখানেই বসবাস শুরু করেন। থাকতেন শ্বশুরবাড়িতে। বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাঁর। আনন্দিতা বলেন, বিয়ের পর থেকে এক রাতও তাঁকে ছাড়া থাকতে পারতেন না আলিফ। প্রতিদিন নিজের হাতে তাঁকে খাইয়ে দিতেন। তাঁর পড়াশোনার পেছনেও স্বামীর বড় অবদান ছিল। আনন্দিতা নার্সিংয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন। তাঁর চাকরির ব্যবস্থাও করছিলেন আলিফ। কাঁদতে কাঁদতে আনন্দিতা বলেন, ‘বলছিলেন, ঢাকা বা সিলেটে চাকরি হলে আমরা এখান থেকে চলে যাব। আমাদের দুটি ছোট বাচ্চা। এখন আমি তাদের নিয়ে কীভাবে থাকব? আমার স্বামীকে যারা নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে, আমি তাদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ আলিফের চাচাশ্বশুর বিশু সাংমা জানান, ঘটনার সময় তাঁরা বাড়ির বাইরে বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে চায়ের দোকানের কাছে গিয়ে আলিফকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর ভাষ্য, দুজন গুলি করছিলেন, আর দুজন কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা এগিয়ে আসার আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যান। আলিফের বড় ভাই শহীদ ইসলাম ফকির বলেন, সাংবাদিকতা করার কারণে তাঁর ভাইয়ের অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল বলে তাঁরা মনে করেন। যারা তাঁকে গুলি করে হত্যা করেছে, তাদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। আলিফের শাশুড়ি শিলা রাংসাও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, দুর্গাপুরে এর আগে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটলেও সেসব ঘটনায় বিচার হয়নি। তিনি বলেন, এবার তাঁর মেয়ের স্বামীকে এতগুলো গুলি করে হত্যা করা হলো। ছোট দুই শিশুকে নিয়ে মেয়ে কীভাবে চলবে, তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ স্বজনদের ভাষ্য, গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা আলিফকে কুপিয়ে জখম করেছিল। ওই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। এ ঘটনায় আলিফ বাদী হয়ে মামলা করেন। পুলিশ নাম উল্লেখ করা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছিল। বর্তমানে তাঁরা জামিনে মুক্ত রয়েছেন বলে স্বজনেরা জানান। হত্যা মামলা, আসামি শনাক্তের চেষ্টা আলিফ হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় সাত থেকে আটজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান জানান, আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। গতকাল বিকেলে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে আলিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, আলিফের বুকে তিনটি গুলির আঘাত ছিল। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং একটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। এ ছাড়া কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে একটি গুলি মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। আরও দুটি গুলির আঘাত ছিল মাথার ওপরের অংশের চামড়া ও ডান কাঁধের পাশে। ক্ষতের ধরন দেখে চিকিৎসকের প্রাথমিক ধারণা, সামনের দিক থেকে পিস্তল দিয়ে তাঁকে গুলি করা হয়েছিল। তেলনজিয়ায় ঘটনাস্থলে চায়ের দোকানের সামনে এখনো শুকনো রক্তের দাগ দেখা যায়। সেখান থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে আলিফের শ্বশুরবাড়ি। বাড়ির সামনে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে বসে কাঁদছিলেন আনন্দিতা। পাশে বসে মা ও স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। স্বামীকে হারিয়ে শোকের পাশাপাশি দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে জীবন চালাবেন, সেই দুশ্চিন্তাও এখন আনন্দিতাকে তাড়া করছে। তাঁর কাছে আলিফ শুধু স্বামী ছিলেন না—ছিলেন নির্ভরতা, সাহস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই মানুষটিই এখন তাঁর কাছে স্মৃতি।