প্রকাশ :: ... | ... | ...

চক্রের ফাঁদে নয়, ট্রেন দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছিল নিখোঁজ শিশু রায়হান


সংযুক্ত ছবি

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা থেকে নিখোঁজ হওয়া ১২ বছর বয়সী শিশু মো. রায়হানকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া চাঞ্চল্যকর দাবির সত্যতা মিলেছে সম্পূর্ণ উল্টো। ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে কোনো চক্র রায়হানের পা কেটে দেয়নি। পুলিশের তদন্ত, হাসপাতালের নথিপত্র এবং অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ট্রেনের ধাক্কায় গুরুতর আহত হওয়ার পরই চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে শিশুটির একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ে যেখানে দাবি করা হয়, একটি চক্র ভিক্ষাবৃত্তির জন্য রাজধানীর কোনো এক স্থানে শিশু রায়হানের পা কেটে দেয়। রায়হানের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকায়। সে স্থানীয় একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করত এবং প্রায় সাত মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে চুনতির একটি মাহফিলে তাকে দেখতে পেয়ে পরিবারের লোকজন শনাক্ত করেন। এ সময় তার ডান পা না থাকায় এবং শরীরে অস্ত্রোপচারের চিহ্ন থাকায় চক্রের মাধ্যমে পা কেটে নেওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, নিখোঁজ থাকার এই দীর্ঘ সময়ে শিশুটি মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার যেভাবে ঢাকা রেলওয়ে থানা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুন ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে গোসল করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ফেরার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ‘কর্ণফুলী এক্সপ্রেস’ ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে গুরুতর আহত হয় রায়হান। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তাকে হাসপাতালের মেঝেতে বসে নিজেই ট্রেনের ছাদ বা ট্রেন থেকে পড়ে আহত হওয়ার কথা বলতে শোনা যায়। সে সময় তার মাথা ও পেটেও আঘাতের চিহ্ন ছিল। দুর্ঘটনার পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ২ জুলাই রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে (জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান) অস্ত্রোপচার করে তার ডান পা কেটে ফেলা হয়। পরবর্তী সময়ে আইসিইউতে রাখার পাশাপাশি মাথায় আঘাতের সুচিকিৎসার জন্য তাকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালেও নেওয়া হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে স্টেশনে আশ্রয় অস্ত্রোপচারের পর প্রায় দেড় মাস রায়হানকে হাসপাতালে থাকতে হয়। এই সময়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ‘আরেছা’ নামের একজন আয়াকে তার সার্বক্ষণিক পরিচর্যার জন্য নিয়োজিত করা হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর রায়হান কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ফিরে আসে এবং সেখানে ‘মালির মা’ হিসেবে পরিচিত জরিনা নামের এক নারীর আশ্রয়ে থেকে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করে। একপর্যায়ে সে বাড়ি যেতে চাইলে তার বন্ধু জাকির তাকে যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে তুলে দেয়। এ সময় রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল রিয়াজুল করিম ও স্টেশনের মিনা নামের এক নারী শিশুটিকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই সহানুভূতিশীল নারীকেই অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল বলে জানায় পুলিশ। পরিবারের বক্তব্য ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন দিনমজুর এবং তার বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ রয়েছে। বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সে সৎমায়ের সঙ্গে থাকত। ট্রেনের ঘটনায় সত্যতা স্পষ্ট হওয়ার পরও রায়হান ও তার পরিবার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়নি। এ বিষয়ে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ জানান, শিশুটির পরিবার অভিযোগ করতে থানায় আসার পর তাদের সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা পরবর্তী সময়ে আর যোগাযোগ করেননি। এ ছাড়া, ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে লোহাগাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজীদ বিন আখন্দকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।