প্রকাশ :: ... | ... | ...

শরৎকালে উত্তরাঞ্চলে শীতের পদধ্বনি


সংযুক্ত ছবি

ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। প্রকৃতি ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলায়। শরৎকাল শেষ হতে এখনো বাকি, শীত আসতেও প্রায় মাসখানেক। এরই মধ্যে উত্তরাঞ্চলের ভোরের প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই জানালা খুললে চোখে পড়ে ধোঁয়াটে সাদা কুয়াশার চাদর। মাঠের কচি ধানের ডগায়, সবুজ ঘাসে ও গাছের পাতায় মুক্তার মতো জমে থাকে শিশির। বাতাসে অনুভূত হচ্ছে হালকা হিমেল পরশ। আশ্বিনের শেষদিকে দিনের গরম আর ভোরের ঠান্ডার এই টানাপোড়েনে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের জনপদে ঋতু পরিবর্তনের আভাস মিলছে। ক্যালেন্ডারের হিসাবে শীত আসতে এখনো দেরি থাকলেও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর আবহাওয়ার মেজাজ বদলে গেছে। বৃষ্টি থামতেই রাতের তাপমাত্রা কমেছে, ভোরের বাতাস হয়েছে শিরশিরে। রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় গত বৃহস্পতিবার দিনভর বৃষ্টির পর শুক্রবার সকালে গাইবান্ধায় তাপমাত্রা নেমে আসে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আগের দিন একই সময়ে তাপমাত্রা ছিল ২৪ ডিগ্রি। এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা কমেছে এক ডিগ্রি। রংপুর আবহাওয়া অফিস জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের কয়েক দিন তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছিল। গাইবান্ধায় শনিবার ভোর ৫টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশা ছিল। সড়ক-মহাসড়কে দূরপাল্লার বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরে চলাচল করে। আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তরবঙ্গে কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টির পর এমন কুয়াশা স্বাভাবিক। তবে তাপমাত্রা এখনো ২৩ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের সাইদুর রহমান বলেন, আশ্বিনের শেষদিকে গত কয়েক বছরে এমন ঘন কুয়াশা দেখা যায়নি। কুয়াশা দেখে মনে হচ্ছে, শীত আসছে। শীতের আগমনী আভাসে মানুষের মনে যেমন আনন্দ, তেমনি ঋতুচক্রের পরিবর্তন নিয়েও ভাবনা রয়েছে। গাইবান্ধা পৌরসভার গোরস্থানপাড়া জামে মসজিদে নামাজ পড়তে আসা শামছুল আলম বলেন, এক দিন আগে বৃষ্টি, এরপর কুয়াশা—বাংলাদেশের ছয় ঋতুর হিসাব যেন কিছুটা বদলে যাচ্ছে। ভোরে হাঁটতে বের হওয়া উত্তম দেবগুপ্তের মতে, এ সময়ে কুয়াশা পড়া স্বাভাবিক হলেও এবার কুয়াশার ঘনত্ব কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে। দিনভর গরম থাকলেও সন্ধ্যার পর হালকা ঠান্ডা আর ভোরের কুয়াশায় শীতের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবছর দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় উত্তরাঞ্চলে শীতের অনুভূতি আগে শুরু হয়। আবহাওয়া-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর অন্যতম কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। হিমালয়ের পাদদেশের কাছাকাছি হওয়ায় শীত মৌসুমে উত্তরের ঠান্ডা বাতাস সহজেই এ অঞ্চলে প্রবেশ করে। গাইবান্ধা, রংপুর, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে এর প্রভাব বেশি অনুভূত হয়। কুয়াশা বাড়লে ঠান্ডার অনুভূতিও বাড়ে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পঞ্চগড়ে প্রতিবছর তুলনামূলক আগে শীত নামে এবং অন্য অনেক এলাকার তুলনায় দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, মৌসুমি বায়ুর নিষ্ক্রিয়তা ও বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশা পড়ছে। বৃষ্টির প্রভাবে দিন ও রাতের তাপমাত্রাও কমেছে। বৃষ্টি কমে গেলে দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে এলেও রাতের তাপমাত্রা খুব বেশি কমছে না। তবে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ভোররাতে শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। কোথাও কোথাও সকাল ৯টা পর্যন্ত কুয়াশা থাকছে। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, শুক্রবার সকাল ৯টায় সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিকে রংপুর আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা জানান, কয়েক দিন ধরে উত্তরবঙ্গের আবহাওয়ায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভোরের দিকে। বৃহস্পতিবারের ভারী বৃষ্টিকে তাঁরা মৌসুমি পরিবর্তনের একটি লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ধীরে ধীরে আরও কমতে পারে। নীলফামারী পৌরসভার আব্দুল হালিম বলেন, গত কয়েক দিন মধ্যরাতের পর পাখার বাতাসেও ঠান্ডা লাগছে। অনেকে গায়ে টানছেন কাঁথা বা হালকা চাদর। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে শীতের এই আমেজ বেশি অনুভূত হচ্ছে। কেউ কেউ কুয়াশায় ঢাকা সকালের দৃশ্য দেখতে ভোরে বের হচ্ছেন, কেউ হাঁটছেন ধানখেতের পাশ দিয়ে। শিশু ও বয়স্কদের কেউ কেউ এরই মধ্যে হালকা গরম কাপড় পরতে শুরু করেছেন। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শীতের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। ঘরে ঘরে লেপ-তোশক রোদে দেওয়া হচ্ছে। হাটবাজারের গরম কাপড়ের দোকানগুলোতেও মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। শীত পুরোপুরি জেঁকে না বসলেও ভোরের কুয়াশা, শিশির আর হিমেল বাতাস জানান দিচ্ছে, সময় বদলাচ্ছে। আবহাওয়া-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, কার্তিক মাস শুরু হলে শীতের আমেজ আরও বাড়তে পারে। তত দিন দিনের গরম আর ভোরের কুয়াশার এই লুকোচুরি চলবে। আশ্বিনের বিদায়বেলায় উত্তরাঞ্চলের মানুষ কুয়াশামাখা সকাল উপভোগের পাশাপাশি অপেক্ষা করছেন নরম- কোমল শীতের।