প্রকাশ :: ... | ... | ...

সাধুসঙ্গে নিজেকে ও অজানাকে জেনে বাড়ি ফিরলেন লালনভক্তরা


সংযুক্ত ছবি

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—মহাত্মা ফকির লালনের এই আধ্যাত্মিক বাণীকে ধারণ করে একতারা, দোতারা, ঢোল আর বাঁশির সুরে মুখর হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি। জাতপাত ও ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে লালনভক্তরা এখানে খুঁজছেন আত্মপরিচয়, জানার চেষ্টা করছেন অজানাকে। গানে, সাধনায় ও সাধুসঙ্গে তাঁরা উপলব্ধি করতে চাইছেন লালনের মানবতাবাদী দর্শন। ফকির লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের লালন স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিনে রোববার (১৮ অক্টোবর) আখড়াবাড়িতে বসে সাধুসঙ্গ। বাল্যসেবা, রাখালসেবা ও পুণ্যসেবার আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সাধনার পর্ব এগিয়ে নেয় লালনভক্তরা। সোমবার শেষ হয় স্মরণোৎসব। লালন ফকির তাঁর জীবদ্দশায় দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে ভক্তদের নিয়ে সাধুসঙ্গ করতেন বলে প্রচলিত রয়েছে। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পয়লা কার্তিক তাঁর দেহত্যাগের পরও অনুসারীরা তাঁকে স্মরণ করে সাধুসঙ্গের ঐতিহ্য ধরে রাখেন। সময়ের পরিক্রমায় লালন একাডেমির আয়োজনে সেই আয়োজন বিস্তৃত হয়ে রূপ নিয়েছে বড় পরিসরের স্মরণোৎসবে। এবারের উৎসবে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে ভক্ত-অনুসারীদের ব্যাপক সমাগম দেখা যায়। আখড়াবাড়ির ভেতরে বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা সাধুদের আস্তানায় চলছে গান ও দর্শনচর্চা। লালনের গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সাধকেরা তুলে ধরছেন মানবপ্রেম, আত্মশুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িকতার কথা। কেউ গানে গানে খুঁজছেন জীবনের অর্থ, কেউবা গুরুর বাণী থেকে খুঁজছেন নিজের অন্তর্জগতের উত্তর। আখড়াবাড়ির বাইরে মূল মঞ্চে রাতে চলে লালনদর্শনবিষয়ক আলোচনা ও সংগীতানুষ্ঠান। পাশাপাশি লালন একাডেমির মাঠে বসেছে বাউল মেলা। গানের সুর, সাধকদের আলোচনা ও ভক্তদের আনাগোনায় পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে এক মিলনমেলায়। উৎসব ঘিরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। সাধুসঙ্গে আসা ভক্তদের বিশ্বাস, গুরুর সান্নিধ্য ও সাধনার মধ্য দিয়ে মনের হিংসা, রাগ-ক্ষোভ ও সংকীর্ণতা দূর করার পথ খুঁজে পাওয়া যায়। লালনের দর্শন তাঁদের কাছে কেবল গান বা আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার এবং নিজের ভেতরের সত্যকে অনুসন্ধানের শিক্ষা। লালন বিশ্লেষক হৃদয় শাহা ফকির বলেন, নিজেকে জানার প্রয়োজন হলেই মানুষ এভাবে ভবের হাটে এসে জড়ো হয়। ভক্তদের মতে, লালনের বাণী ও মানবতাবাদী দর্শন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলেই স্মরণোৎসবের আয়োজন সার্থক হবে। তাঁদের কাছে ছেঁউড়িয়ার সাধুসঙ্গ তাই শুধু বার্ষিক মিলনমেলা নয়, আত্মঅনুসন্ধান ও মানবিক বন্ধনেরও এক বিশেষ উপলক্ষ।