গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের ভোকেশনাল মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তরপত্র পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। চার বিষয়ে নম্বর শূন্য পাওয়ার পর বোর্ডে খাতা চ্যালেঞ্জ করে পাস করেছেন এক শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র সংরক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে জানা যায়, উপজেলার ধর্মপুর এসআইডি ভোকেশনাল মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কারিগরি কলেজের শিক্ষার্থী আল রিশাদ মুগ্ধ ২০২৬ সালের ভোকেশনাল স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় এসআইডি পরীক্ষা কেন্দ্রে অংশ নেন। কেন্দ্রটির ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট ও কেন্দ্রসচিব মঞ্জুয়ারা বেগমের সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীর বাবা মাহিদুল ইসলামের আদালতে মামলা-মোকদ্দমা চলমান রয়েছে। এর জেরে প্রতিশোধ নিতে মাহিদুল ইসলামের ছেলে আল রিশাদ মুগ্ধের উত্তরপত্রে কারসাজি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ আগস্ট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আল রিশাদ মুগ্ধ অকৃতকার্য হন। ফলাফল ও নম্বরপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অন্যান্য বিষয়ে সন্তোষজনক নম্বর পেলেও বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়—এই চার বিষয়ে কোনো নম্বর পাননি তিনি। এরপর ১১ আগস্ট বোর্ডে খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করেন শিক্ষার্থী ও তাঁর বাবা। ১৩ আগস্ট তাঁরা বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে উপস্থিত হন। এ সময় উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী জাকারিয়া আব্বাসী জানান, চারটি বিষয়ের উত্তরপত্রে কোনো লেখা নেই, শুধু সাদা কাগজ রয়েছে। পরবর্তীতে ১০ সেপ্টেম্বর বোর্ড চ্যালেঞ্জের ফল প্রকাশ করা হলে দেখা যায়, বাংলা বিষয়ে ১৩০, ইংরেজিতে ১৩১, গণিতে ১৬৫ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ১১৭ নম্বর পেয়েছেন আল রিশাদ মুগ্ধ। তাঁর জিপিএ দাঁড়ায় ৪.৬৫ এবং তিনি কৃতকার্য হন। যে চার বিষয়ে প্রথমে অকৃতকার্য করা হয়েছিল, সেগুলোতেই পরবর্তীতে নম্বর পেয়ে পাস করায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীর লেখা উত্তরপত্র কীভাবে সাদা কাগজে পরিণত হলো, বোর্ড চ্যালেঞ্জের পর কী প্রক্রিয়ায় ফলাফলে পরিবর্তন এলো—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মূল উত্তরপত্র সরিয়ে সাদা খাতা ঢোকানোর মতো কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তা শুধু একজন পরীক্ষার্থীর ফলাফলের বিষয় নয়, পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত। এ ঘটনায় পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে উত্তরপত্র বোর্ডে পাঠানোর আগ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, উত্তরপত্র গ্রহণ ও সংরক্ষণকারী কর্মকর্তা এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেন্দ্রসচিব মঞ্জুয়ারা বেগম এবং পরীক্ষা কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজু মিয়া, হামিদুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, মফিদুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শিক্ষা সচিব, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক, সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আল রিশাদ মুগ্ধের বাবা মাহিদুল ইসলাম। উত্তরপত্র পরিবহন, গ্রহণ, সংরক্ষণ, বাছাই ও মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষানুরাগী মহলের মতে, একজন পরীক্ষার্থীর চারটি বিষয়ের উত্তরপত্রে কোনো লেখা না থাকা এবং পরবর্তীতে বোর্ড চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে একই চার বিষয়ে পাস করার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় পরীক্ষা কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ, উত্তরপত্রের প্যাকেট ও সিল, প্রেরণ রেজিস্টার, উত্তরপত্রের কভার সেলাই ও স্ট্যাপলিংয়ের ধরনসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রকৃতপক্ষে উত্তরপত্রে কীভাবে কারসাজি হয়েছিল এবং এর জন্য কারা দায়ী—তা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রসচিব মঞ্জুয়ারা বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, উত্তরপত্রে কারসাজির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। কেন্দ্রসচিব হিসেবে এ বিষয়ে তাঁর দায় এড়ানোর সুযোগ আছে কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। সাদা উত্তরপত্রে শিক্ষার্থী পাস করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেল করা পরীক্ষার্থীকে বোর্ড কর্তৃপক্ষ কীভাবে পাস করিয়েছে, তা তাঁর জানা নেই। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আতাউর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাঁরা দেখভাল করেন না। এ কারণে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি ক্ষুদে বার্তায় জানান, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।