পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি সরকারের, হতাহত অন্তত ১৪
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) চালানো এ হামলায় অন্তত দুই নিরাপত্তারক্ষী নিহত ও ছয়জন আহত হওয়ার খবর প্রথমে পাওয়া যায়। পরে সামরিক সূত্রের বরাতে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে চারজন নিহত ও ১০ জন আহত হওয়ার তথ্য জানায় সংবাদমাধ্যমগুলো। প্রধানমন্ত্রী শায়া জিন্দানি ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা অক্ষত রয়েছেন বলে জানিয়েছে সরকার।
ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-ইরয়ানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, হুথিরা এডেনের আল-মাশিক প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা ওই এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। বিস্ফোরণের পর প্রাসাদসংলগ্ন এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সটি এডেনে অবস্থিত। রাজধানী সানা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় এডেনকে অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করে সরকার। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনায় হামলাকে দেশটির চলমান সংঘাতের উল্লেখযোগ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রধান কার্যালয়কে লক্ষ্য করে হুথিদের এ ধরনের হামলা বিরল ঘটনা। এতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা কমপ্লেক্সে থাকলেও তাঁরা নিরাপদে আছেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী নায়েফ সালেহ আল-বাকরিও বলেছেন, হামলার পরও সরকার এডেন ছাড়বে না। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের প্রতিবেদনে পার্থক্য রয়েছে। প্রাথমিকভাবে দুই নিরাপত্তারক্ষী নিহত ও ছয়জন আহত হওয়ার খবর এলেও পরে এএফপিকে ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর তিনটি সূত্র অন্তত চারজন নিহত ও ১০ জন আহত হওয়ার কথা জানায়।
হুথি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের ভেতরে সৌদি কর্মকর্তাদের পরিচালিত একটি সামরিক অভিযানকেন্দ্র এবং অস্ত্রের গুদাম। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি সামরিক উপস্থিতিকে লক্ষ্য করার নীতির অংশ হিসেবে হামলার কথা বলেছেন। তবে লক্ষ্যবস্তু ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে হুথিদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এডেনে হামলার ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তায়েজ শহর ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষ এবং অবরোধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এ অঞ্চল সামরিক ও বাণিজ্যিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এই নৌপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইয়েমেনের সংঘাত ২০১৪ সালে হুথিদের রাজধানী সানা দখলের পর নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। পরের বছর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। ২০২২ সালে হুথি ও সৌদি নেতৃত্বাধীন পক্ষগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষ আবার বেড়েছে। ফলে দেশটিতে রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নতুন করে চাপে পড়েছে।
এদিকে ইয়েমেনের সংঘাতের প্রভাব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সৌদি আরব ও আশপাশের অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি দাবি করেছেন, হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। জোটের অভিযোগ, হুথিরা আঞ্চলিক উৎস থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে হুথিদের বক্তব্য ও স্বাধীন যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এডেনে সরকারের প্রধান কার্যালয় লক্ষ্য করে হামলা সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এ হামলা একাই ইয়েমেনে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ অনিবার্য করে তুলেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। সংঘাতের পরিধি, সরকারি বাহিনীর পাল্টা পদক্ষেপ, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ভূমিকা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের গতিপ্রকৃতিই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়।
প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে হামলার পর ইয়েমেন সরকার নিরাপত্তা জোরদার এবং ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এখন নজর থাকবে, সরকার কীভাবে হামলার জবাব দেয় এবং নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক পক্ষগুলো কোনো উদ্যোগ নেয় কি না।