উয়েফা নেশন্স লিগে বৃহস্পতিবার রাতে দুই ভিন্ন গল্প লিখেছে ইউরোপের দুই পরাশক্তি। ডেনমার্কের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলের রোমাঞ্চকর জয় পেয়েছে পর্তুগাল। অন্যদিকে সার্বিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে নতুন কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের অধীনে তিন ম্যাচ পর প্রথম জয়ের দেখা পেয়েছে জার্মানি। ডেনমার্কের মাঠে পর্তুগালের জয়ের নায়ক জোয়াও ফেলিক্স ও জোয়াও কান্সেলোদের পাশাপাশি গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়া ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন গনসালো রামোস ও ভিতিনিয়াও। এই জয়ে ‘এ’ লিগের চার নম্বর গ্রুপে টানা তিন ম্যাচ জিতে ৯ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান আরও শক্ত করেছে পর্তুগাল।
অন্যদিকে দুইবার পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানো ডেনমার্ক শেষ পর্যন্ত আর পারেনি। জোয়াও কান্সেলো, গনসালো রামোস, ভিতিনিয়া ও জোয়াও ফেলিক্সের গোলে পর্তুগাল জয় নিশ্চিত করে। স্বাগতিকদের হয়ে গোল করেন মিকেল ডামসগার্ড ও রাসমুস হয়লুন।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখলে এগিয়ে ছিল পর্তুগাল। ১১ মিনিটে কান্সেলোর গোলে এগিয়ে যায় সফরকারীরা। পোস্টে লেগে ফিরে আসা বল পুরোপুরি বিপদমুক্ত করতে পারেনি ডেনমার্ক। সেই সুযোগে ব্রুনো ফের্নান্দসের সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে বক্সে ঢুকে গোলরক্ষকের ওপর দিয়ে বল জালে পাঠান বার্সেলোনার এই ডিফেন্ডার।
তবে দুই মিনিটের মধ্যেই সমতায় ফেরার সুযোগ তৈরি করে ডেনমার্ক। মর্টেন ইউলমারের শট পোস্ট ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। এরপর ২২ মিনিটে রাফায়েল লেয়াওয়ের জোরালো শটও ঠেকিয়ে দেন ডেনিশ গোলরক্ষক। ২৩তম মিনিটে অবশ্য সমতা ফেরে। ডি-বক্সের বাঁ দিকে সতীর্থের পাস পেয়ে দূরের পোস্ট লক্ষ্য করে দারুণ শটে গোল করেন ডামসগার্ড। জাতীয় দলের হয়ে সবশেষ ১০ ম্যাচে এটি তার ষষ্ঠ গোল।
সমতায় ফেরার আনন্দ অবশ্য বেশি সময় ধরে রাখতে পারেনি ডেনমার্ক। দুই মিনিট পরই আবার এগিয়ে যায় পর্তুগাল। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের দুই খেলোয়াড়ের মাঝ থেকে বল নিয়ে রামোসকে দেন ফের্নান্দস। এরপর অধিনায়কের ফিরতি পাস নিয়ে বক্সে ঢুকে নিখুঁত শটে গোল করেন এসি মিলানের এই ফরোয়ার্ড।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আবার ম্যাচে ফেরে ডেনমার্ক। ৫৩ মিনিটে ডামসগার্ডের থ্রু পাস ধরে বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ের শটে গোল করেন নাপোলির ফরোয়ার্ড হয়লুন। এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নিজেদের হাতে নেয় পর্তুগাল। ৬৪ মিনিটে ব্রুনো ফের্নান্দসের ক্রস থেকে জোরালো হেডে জাতীয় দলের হয়ে নিজের প্রথম গোল করেন ভিতিনিয়া। শেষ দিকে বদলি হিসেবে নামা জোয়াও ফেলিক্স ৮৭ মিনিটে দালোতের পাস পেয়ে ডান পায়ের শটে গোল করলে ডেনমার্কের ঘুরে দাঁড়ানোর সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।
পর্তুগালের জয়টি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মাঠের বাইরেও দলকে ঘিরে আলোচনা ছিল। কোচের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের খবরের মধ্যে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিজেই নিশ্চিত করেছিলেন। এরপর তার সাত নম্বর জার্সি রাফায়েল লেয়াওকে দেওয়ার সিদ্ধান্তও আলোচনায় আসে। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে এসব ঘটনার দৃশ্যমান প্রভাব পড়তে দেয়নি পর্তুগাল।
অন্যদিকে জার্মানির জন্য রাতটি ছিল স্বস্তির। নতুন কোচ ক্লপের অধীনে তিন ম্যাচ পর প্রথম জয় পেল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বায়ার্ন মিউনিখের আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় সার্বিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়েছে তারা।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণে আধিপত্য দেখায় জার্মানি। প্রায় ৭৪ শতাংশ বল নিজেদের দখলে রেখে মোট ৩২টি শট নেয় স্বাগতিকরা, যার আটটি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে সার্বিয়া পুরো ম্যাচে মাত্র একটি শট নিতে পেরেছে।
তবে গোল পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৩৯ মিনিট পর্যন্ত। ভিয়েৎসের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে ফিরতি বল জোরালো শটে জালে পাঠান ২১ বছর বয়সী টম বিশফ। জাতীয় দলের হয়ে এটি তার প্রথম গোল। এর আগে ৩০ মিনিটে গোলের সহজ সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি সের্গে জিনাব্রি। নিক ভল্টেমাডারের পাস পেয়ে একা গোলরক্ষকের সামনে গিয়েও পেত্রোভিচকে পরাস্ত করতে পারেননি তিনি। পাঁচ মিনিট পর ভিয়েৎসের হেডও ঠেকিয়ে দেন সার্বিয়ার গোলরক্ষক। দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণের ধার কমেনি জার্মানির। ৬১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ফ্লোরিয়ান ভিয়েৎস। বক্সে সতীর্থের পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জোরালো শটে বল জালে পাঠান লিভারপুলের এই তারকা। শেষ দিকে গোলের জন্য মরিয়া হলেও সার্বিয়া জার্মানির রক্ষণে তেমন চাপ তৈরি করতে পারেনি। ৭৮ মিনিটে তাদের একমাত্র শটটিও ঠেকিয়ে দেন জার্মান গোলরক্ষক ইয়োনাস উরবিগ।
ক্লপের অধীনে প্রথম দুই ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র এবং গ্রিসের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল জার্মানি। তৃতীয় ম্যাচে এসে সার্বিয়ার বিপক্ষে জয় পেল তারা।
গ্রুপের অন্য ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে দুই গোলে এগিয়ে থেকেও জয় ধরে রাখতে পারেনি গ্রিস। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়েছে। গ্রিসের হয়ে প্রথমার্ধে দুই গোল করেন দুই ভিন্ন খেলোয়াড়। দ্বিতীয়ার্ধে ৫৯ মিনিটে ডাচ অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক ব্যবধান কমান। ৮৯ মিনিটে টিয়ানি রেইন্ডার্স গোল করে নেদারল্যান্ডসকে হার থেকে বাঁচান।
তিন ম্যাচ শেষে গ্রিস ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে। নেদারল্যান্ডসের পয়েন্ট ৫, জার্মানির ৪ এবং সার্বিয়া এখনো পয়েন্টশূন্য।
অন্যদিকে পর্তুগালের গ্রুপে তিন ম্যাচে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে তারা। ডেনমার্ক, নরওয়ে ও ওয়েলসের পয়েন্ট ৩ করে। নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে ওয়েলসও লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
একই রাতে তাই পর্তুগালের গল্পটি ছিল শিরোপাধারীদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার, আর জার্মানির গল্পটি ছিল নতুন কোচের অধীনে ঘুরে দাঁড়ানোর। নেশন্স লিগের গ্রুপ পর্ব যত এগোচ্ছে, দুই দলের লক্ষ্যও তত স্পষ্ট হচ্ছে—পর্তুগালের সামনে শীর্ষস্থান ধরে রেখে পরবর্তী ধাপে যাওয়া, আর জার্মানির সামনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার লড়াই।