দুই বছরে বেশির ভাগ কীটনাশকের দাম বেড়েছে গড়ে ২০ শতাংশ, কোনো কোনো পণ্যের দাম ছয় মাসে বেড়েছে তিনবার
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক ও বালাইনাশকের বাজারেও। গত দুই বছরের ব্যবধানে বেশির ভাগ কীটনাশক ও বালাইনাশকের দাম বেড়েছে গড়ে ২০ শতাংশ। কোনো কোনো পণ্যের দাম ছয় মাসের ব্যবধানে তিনবার পর্যন্ত বাড়ানোর অভিযোগ করেছেন বিক্রেতারা। এতে বাড়তি খরচের চাপে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির অসংখ্য কীটনাশক, মাকড়নাশক, ছত্রাকনাশক ও আগাছানাশক রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানির অর্ধশতাধিক পণ্যের চাহিদা ও বিক্রি তুলনামূলক বেশি। বাজারে প্রচলিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে বায়ার, সেমকো, সিনজেনটা, অটোক্রপ, এসিআই, সেতু করপোরেশন, ন্যাশনাল ও পদ্মা অয়েল।
যশোর শহর ও বিভিন্ন উপজেলার সার ও কীটনাশকের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, গত এক বছরে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ও বালাইনাশকের দাম গড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ পর্যন্ত।
সার, ছত্রাকনাশক ও মাকড়নাশক হিসেবে ব্যবহৃত থিয়োভিটের দাম এর একটি উদাহরণ। আগে প্রতি কেজি ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ৩০০ টাকা। আগাছানাশক প্যারাকোয়াটের ২০ লিটারের ড্রামের দাম বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ টাকা। আগে এটির দাম ছিল ৪ হাজার ২০০ টাকা।
মাইক্রোথিয়া নামের সার, ছত্রাকনাশক ও মাকড়নাশক এখন প্রতি কেজি ৩৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছয় মাস আগেও এর দাম ছিল ৩০০ টাকার কম। ছত্রাকনাশক ম্যানসারের ১০০ মিলিলিটারের দাম এখন ২০০ টাকা এবং ৫০০ মিলিলিটার ৯০০ টাকা। ছয় মাস আগে এ পণ্যের দাম ছিল প্রায় ২০ শতাংশ কম।
উদ্ভিদের জৈব উজ্জীবক লিটোসেনের ১০০ মিলিলিটারের দাম ১৯৩ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০৫ টাকা। ছত্রাকনাশক সেলটিমারের ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ২০ টাকা করে বেড়েছে। কীটনাশক মর্টারের দামও বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।
কীটনাশক মার্শালের ৫০০ মিলিলিটারের দাম এক বছরে ৮৩০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৮৫ টাকা। সুমিথিয়ানের দাম কার্টনপ্রতি বেড়েছে ২৫০ টাকা। নুট্রাফসের ১০০ মিলিলিটারের দাম ১৭০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০৫ টাকা।
কৃষকেরা বলছেন, বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার কারণ সম্পর্কে তাঁদের জানার সুযোগ কম। অনেক সময় বাকিতে কীটনাশক কিনতে হওয়ায় দোকানিরা যে দাম বলেন, সেটিই দিতে হয়।
যশোর সদর উপজেলার মাহিদিয়া এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, “কীটনাশক লাগলে দোকানদারকে বললে দিয়ে দেয়। বাকিতে কিনতে হয় বলে যে দাম বলে, তাই দিয়ে কিনতে হয়। বাড়তি দাম বললেও দিতে হয়। শুধু বলে, কোম্পানি দাম বাড়িয়েছে।”
বিক্রেতাদের ভাষ্য, তাঁরা নিজেরা ইচ্ছামতো দাম বাড়ান না। ডিলার বা কোম্পানির কাছ থেকে যে দামে পণ্য কিনতে হয়, তার ভিত্তিতেই খুচরা মূল্য নির্ধারিত হয়। কোম্পানিগুলো খুচরা মূল্য বাড়িয়ে দিলে তাঁদেরও বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়।
শহরতলির পুলেরহাট বাজারের মেসার্স আব্দুর রাজ্জাক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সময়ে কীটনাশক ও বালাইনাশকের দাম বাড়ে। তাঁরা ডিলারের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন। কোম্পানি খুচরা মূল্য বাড়িয়ে দিলে তাঁদেরও বাড়তি দামে কিনতে হয়। কেন দাম বাড়ানো হলো, তা নিয়ে তাঁদের কেউ কিছু জানান না।
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি এলাকার সার ও কীটনাশক বিক্রেতা কামরুজ্জামান বলেন, “কীটনাশকের দাম কোম্পানিগুলো নির্ধারণ করে দেয়। তারা যেভাবে দাম লিখে দেয়, সেভাবেই বিক্রি হয়। এ নিয়ে আমাদের কিছু করার থাকে না।”
যশোর শহরের অন্যতম বড় সার ও কীটনাশক বিক্রেতা সোনার বাংলা কৃষি ভান্ডারের পরিচালক নুরুদ্দিন মোহাম্মদ তারেক খান বলেন, কোম্পানিগুলোই কীটনাশক ও বালাইনাশকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং তারাই দাম নির্ধারণ করে দেয়। একটি পণ্যের দাম ছয় মাসের মধ্যে তিনবার পর্যন্ত বাড়ার ঘটনাও দেখা গেছে।
তিনি বলেন, সরকার কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দেয়। ফলে কীটনাশকের দাম কেন বাড়ছে, তা খতিয়ে দেখা এবং দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কীটনাশকের দাম বাড়ার পাশাপাশি এর অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারও কৃষকের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগ বা পোকার আক্রমণের প্রকৃতি না বুঝেই বিক্রেতার পরামর্শে কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করেন।
যশোরের চুড়ামনকাটি এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, কীটনাশক বা বালাইনাশক বিক্রির ক্ষেত্রে স্থানীয় বিক্রেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, অনেক সময় বিক্রেতাদের পরামর্শে কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করেন। সমস্যা মনে হলেই তাঁরা বিক্রেতা বা কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। এতে প্রয়োজনের তুলনায় কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে যায়।
রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের মতো করে কীটনাশকের দাম নির্ধারণ করে দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে নীতিমালা থাকা দরকার। পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ কমানো সম্ভব।
কৃষকদের মতে, উৎপাদন খরচের বড় অংশ যায় সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচে। এর মধ্যে কীটনাশকের দাম নিয়মিত বাড়তে থাকলে ফসলের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে কৃষকের লাভে এবং বাজারে কৃষিপণ্যের দামে। তাই কীটনাশকের দাম নির্ধারণ ও বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি চান তাঁরা।
**ট্যাগ:** কীটনাশক, বালাইনাশক, কৃষক, কীটনাশকের দাম, কীটনাশকের বাজার, কৃষি, কৃষি উৎপাদন খরচ, যশোর, সার, ছত্রাকনাশক, মাকড়নাশক, আগাছানাশক, কৃষি উপকরণ, কৃষকের ব্যয়, কৃষি বাজার