কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় আবাসিক হোটেলের সংকট সহসাই কাটছে না। অগ্নিনিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে না মানার অভিযোগে কয়েকশ হোটেল বন্ধ করে দেওয়ার পর বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা, ব্যবসা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কলকাতায় যাওয়া মানুষজন। বিশেষ করে নিউমার্কেট এলাকায় থাকার জায়গা খুঁজতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেকেই।
তবে হোটেল-সংকটের কারণে বাংলাদেশি পর্যটকদের কলকাতা আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। স্থানীয় পরিবহন ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রাথমিকভাবে হোটেল পেতে সমস্যা হলেও খোঁজ করলে এখনো থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যাচ্ছে। অনেককে অবশ্য নিউমার্কেটের বাইরে অপেক্ষাকৃত দূরের এলাকায় যেতে হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল বন্ধ
গত ১৯ আগস্ট কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর আবাসিক হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয় কলকাতা করপোরেশন, কলকাতা পুলিশ ও রাজ্যের ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা এবং জরুরি বহির্গমনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগে নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় কয়েকশ আবাসিক হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে বাংলাদেশি পর্যটকদের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে চিকিৎসা বা অন্যান্য কাজে কলকাতায় আসা মানুষও আবাসন-সংকটে পড়েছেন।
বারবার বদলাতে হচ্ছে হোটেল
বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা খায়রুল হুদা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গেছেন। হোটেল বন্ধের কারণে গত দুই দিনে তাকে কয়েকবার থাকার জায়গা পরিবর্তন করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জরুরি বহির্গমন পথ বা ইমার্জেন্সি ফায়ার এক্সিট রয়েছে, এমন একটি হোটেলে উঠেছেন তিনি। খায়রুল হুদা বলেন, ইমার্জেন্সি ফায়ার এক্সিট না থাকায় অনেক হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সকালে কোনো হোটেলে উঠলেও বিকেলে সেটি ছেড়ে দিতে বলা হচ্ছে। এ কারণে তাঁকে একের পর এক হোটেল পরিবর্তন করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, আগের কয়েকটি হোটেলে জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা ছিল না। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সও নেই। এ কারণে সেসব হোটেল ছেড়ে দিতে হয়েছে।
খায়রুল হুদার মতো চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া অনেক বাংলাদেশির জন্য নিউমার্কেট এলাকার আবাসন সংকট বাড়তি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এ এলাকায় হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধের দোকান, খাবারের দোকান, মানি এক্সচেঞ্জ ও পরিবহনসহ প্রয়োজনীয় অনেক সেবা সহজে পাওয়া যায়।
কবে খুলবে, অনিশ্চয়তা
হোটেল বন্ধের প্রভাব পড়েছে নিউমার্কেট এলাকার পর্যটন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও। তবে বন্ধ হয়ে যাওয়া হোটেলগুলো কবে আবার চালু হতে পারবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সময়সীমা জানা যায়নি। মার্কুইস স্ট্রিটে আর এন টেগোর হাসপাতালের অধীন একটি আউটলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাফর খান বলেন, তাঁর ৫০ বছরের পেশাজীবনে এ ধরনের পরিস্থিতি আগে দেখেননি। হোটেল বন্ধ থাকায় পর্যটন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানান তিনি। জাফর খান বলেন, হোটেলগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। দ্রুত নিরাপত্তাবিধি মেনে হোটেলগুলো খুলে দেওয়া গেলে পর্যটক, রোগী ও স্থানীয় ব্যবসায়ী—সবার জন্যই ভালো হবে।
### বাংলাদেশি পর্যটক আসা বন্ধ হয়নি
হোটেল সংকট তৈরি হলেও বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় পর্যটক আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন নিউমার্কেট এলাকার একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। গ্রিন লাইন পরিবহন সংস্থার ম্যানেজার শ্যামল ঘোষ বলেন, হোটেল-সংকটের কারণে বাংলাদেশি পর্যটকদের কলকাতায় আসা কমে গেলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের পরিবহনে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিনই যাত্রী আসছেন। তাঁর মতে, নিউমার্কেট ও মার্কুইস স্ট্রিট এলাকার অন্যতম বিশেষত্ব হলো—একটি নির্দিষ্ট এলাকায় থাকা, চিকিৎসা, কেনাকাটা, খাবার ও যাতায়াতসহ অনেক প্রয়োজন মেটানো যায়। এ কারণে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়। শ্যামল ঘোষ বলেন, কলকাতায় বিকল্প হিসেবে অনেক হোটেল রয়েছে। তবে নিউমার্কেটের হোটেল বন্ধ থাকায় অনেক পর্যটককে অন্য এলাকায় চলে যেতে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখছেন এবং দ্রুত এর সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রোগী ও বয়স্করা
নিউমার্কেট এলাকার হোটেল সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশিদের ওপর। চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের অনেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল বা বয়স্ক। হাসপাতাল থেকে দূরের কোনো এলাকায় হোটেল নিতে হলে নিয়মিত যাতায়াতই তাঁদের জন্য বাড়তি কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালে যাওয়া-আসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ সংগ্রহ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ক্ষেত্রে সময় ও পরিবহন খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রেখে হোটেল বন্ধের সিদ্ধান্তকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা এড়াতে আবাসিক হোটেলে জরুরি বহির্গমন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকা জরুরি। তবে একই সঙ্গে নিরাপত্তাবিধি পূরণকারী হোটেলগুলো দ্রুত চালুর ব্যবস্থা করার দাবিও রয়েছে।
বাংলাদেশি পর্যটক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, নিরাপত্তার ঘাটতি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যেসব হোটেল নির্ধারিত অগ্নিনিরাপত্তাবিধি পূরণ করতে সক্ষম, সেগুলো দ্রুত খুলে দেওয়া হবে। এতে একদিকে যেমন পর্যটকদের ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে নিউমার্কেটকেন্দ্রিক পর্যটন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমও স্বাভাবিক হবে।
নিউমার্কেটের হোটেল-সংকট কবে পুরোপুরি কাটবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো জানা না গেলেও বাংলাদেশি পর্যটক, চিকিৎসাপ্রার্থী, হোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নজর এখন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।