- ৪১ বছরের শুটার থেকে ১২ বছরের স্কেটবোর্ডার—তৃণমূল, পরিবার, স্কুল, সরকার ও ফেডারেশনের সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে চীনের ক্রীড়া শক্তি
নাম ছাও শিকি। বয়স মাত্র ১২। প্রথমবার এশিয়ান গেমসে এসে চীনের স্কেটবোর্ড দলের হয়ে উইমেন’স পার্ক ইভেন্টে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। চাকার ওপর দাঁড়িয়ে শূন্যে ভেসে, লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে নানা কসরত দেখিয়ে প্রিলিমিনারি হিটে নিজের গ্রুপে তৃতীয় এবং সব হিট মিলিয়ে পঞ্চম হয়ে উঠেছিলেন ফাইনালে। পদকের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত চতুর্থ হয়েছেন। কিন্তু চীনের কাছে সেটিও যেন গল্পের একটি অংশ—কারণ দেশটির ক্রীড়া দর্শনে চতুর্থ স্থান কোনো শেষ কথা নয়।
প্রিলিমিনারি হিটে শিকির সেরা স্কোর ছিল ৭৩.৪৯। চীনের প্রতিযোগীদের মধ্যে সেটিই ছিল সর্বোচ্চ। তাঁর পেছনে ছিলেন ১৩ বছর বয়সী মেং লিঙ্গিয়ান, যিনি করেন ৭২.৫৩। ফাইনালে চার রানের মধ্যে শেষটিতে শিকির স্কোর ৮১.২৩। ব্রোঞ্জজয়ী জাপানের ওকামোতো মিসুগুর স্কোর ছিল ৮২.৮৬।
তবু শিকির গল্প আলাদা। কারণ তাঁর বয়স। এই ইভেন্টে সোনা জেতা জাপানের মিজুহো হাসেগাওয়ার বয়স ১৫, রুপাজয়ী চাইনিজ তাইপের লিন ই-ফানের ১৪ এবং ব্রোঞ্জজয়ী ওকামোতোর ২০। তাঁদের পাশে ১২ বছরের শিকি যেন চীনের ক্রীড়া ব্যবস্থার ভবিষ্যতের একটি প্রতিচ্ছবি। এবারের এশিয়ান গেমসে চীনের ৮১৫ সদস্যের দলে তিনিই সর্বকনিষ্ঠ।
শিকির গল্প অবশ্য এশিয়ান গেমসের মঞ্চে এসে শুরু হয়নি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্কেটবোর্ডে পা রাখেন তিনি। যে বয়সে শিশুরা খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সেই স্কেটবোর্ড হয়ে ওঠে তাঁর খেলার সঙ্গী।
২০২২ সালে ‘চায়না স্কেটবোর্ড ক্লাব’-এর প্রশিক্ষণ শিবিরের নারী বোল ইভেন্টের জন্য নির্বাচিত হন শিকি। কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শারীরিক অনুশীলন শেষে পান ‘টু-স্টার অ্যাথলেট’ সনদ। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ পান তিনি।
এরপর সাফল্যও আসতে থাকে দ্রুত। ওই বছরই এক্স গেমস চায়না স্কেটবোর্ডিং ইউ-পুল ট্যুরের বেইজিং পর্বে নারী বিভাগে দ্বিতীয় হন। পরে ১৬তম বেইজিং মিউনিসিপ্যাল গেমসের স্কেটবোর্ডিং প্রদর্শনী প্রতিযোগিতায় বোল ইভেন্টে সোনা জেতেন।
২০২৩ সালে বেইজিং ইয়ুথ ইউ-সিরিজ স্কেটবোর্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপের অনূর্ধ্ব-১২ বিভাগে বোল ও স্ট্রিট—দুই ইভেন্টেই সাফল্য পান। এরপর বেইজিং মিউনিসিপ্যাল স্পোর্টস ব্যুরো তাঁকে জাতীয় প্রথম শ্রেণির ক্রীড়াবিদের মর্যাদা দেয়।
২০২৪ সালেও থামেনি তাঁর অগ্রযাত্রা। বেইজিং ইয়ুথ স্কেটবোর্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপে নারী গ্রুপ বি বোল চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। একই বছর চায়না ইয়ুথ ইউ-সিরিজ স্কেটবোর্ডিং ট্যুরের তিয়ানজিন পর্বে অনূর্ধ্ব-১২ বোল ইভেন্টেও হন চ্যাম্পিয়ন।
২০২৫ সালে সিসিটিভির ‘হিরোজ আউট অব ইয়ুথ’ অনুষ্ঠানে স্কেটবোর্ডিংয়ের কঠিন সব কৌশল দেখিয়ে আলোচনায় আসেন। বছরের শেষ দিকে ১৫তম জাতীয় গেমসের নারী বোল ইভেন্টের সেমিফাইনালে ৭৯.৬৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়ে ফাইনালে ওঠেন। শেষ করেন সপ্তম হয়ে। তবে ওই ফাইনালের সর্বকনিষ্ঠ প্রতিযোগী ছিলেন তিনিই।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চায়না রোলার স্পোর্টস স্কেটবোর্ডিং ওপেনের নারী বোল গ্রুপ ডি-তে চ্যাম্পিয়ন হন শিকি। এরপর জাতীয় স্কেটবোর্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপের নারী বোল ইভেন্টেও সেরা হন। সেই ধারাবাহিকতাই তাঁকে এনে দেয় এশিয়ান গেমসের মঞ্চে।
শিকির গল্পকে বিচ্ছিন্ন কোনো সাফল্য হিসেবে দেখছেন না চীনা ক্রীড়া বিশ্লেষকেরা। বরং তাঁর বেড়ে ওঠার ভেতরেই তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন দেশটির ক্রীড়া ব্যবস্থার পরিবর্তনের ছবি।
শিনহুয়া নিউজ এজেন্সির সাংবাদিক গাও পেং বলেছেন, চীনের ক্রীড়াঙ্গনে এখন শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা নেই। অনেক তরুণ খেলোয়াড় পরিবার, স্থানীয় ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ, স্কুল ও ফেডারেশনের সমন্বিত সহায়তায় বেড়ে উঠছেন। স্কেটবোর্ডিং, স্পোর্ট ক্লাইম্বিং ও টেনিসের মতো খেলায় এই পরিবর্তন বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
ঝেং কিনওয়েনের মতো টেনিস তারকার উদাহরণ টেনে গাও পেং বলেন, অনেক ক্রীড়াবিদ পরিবারকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে উঠে আসছেন। সরকার সহায়তা করছে, কিন্তু সবাই সরাসরি রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণ কাঠামোর অধীনে থাকছেন না। এই ব্যবস্থায় পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু খেলাধুলায় আগ্রহ দেখালে পরিবার তাকে প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে ভালো করলে ফেডারেশন তাকে চিহ্নিত করছে। জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য এলে যুক্ত হচ্ছে আরও উন্নত প্রশিক্ষণ, কোচিং, চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ। অর্থাৎ প্রতিভা খুঁজে বের করার কাজটি কেবল জাতীয় দলের ক্যাম্পে শুরু হচ্ছে না; সেটি শুরু হচ্ছে আরও নিচে—স্কুল, ক্লাব, স্থানীয় প্রতিযোগিতা ও পরিবারের ভেতর থেকে।
চীনের এই ব্যবস্থার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগও রয়েছে। ক্রীড়া অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্টেডিয়াম ও সাধারণ মানুষের শরীরচর্চার সুযোগ তৈরিতে দেশটি বছরের পর বছর বিনিয়োগ করেছে বলে গাও পেং উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে সাঁতার, দৌড় ও ব্যাডমিন্টনের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলার পাশাপাশি স্কেটবোর্ডিং ও স্পোর্ট ক্লাইম্বিংয়ের মতো নতুন খেলাতেও যুক্ত করা হচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল এশিয়ান গেমসের পদক তালিকাতেও স্পষ্ট।
চীন ১৯৭৪ সালে তেহরান এশিয়ান গেমসে প্রথম অংশ নিয়ে ৩৩টি সোনা, ৪৬টি রুপা ও ২৭টি ব্রোঞ্জসহ ১০৬টি পদক জিতে তৃতীয় হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে দ্বিতীয় হওয়ার পর ১৯৮২ সালের নয়াদিল্লি এশিয়ান গেমসে ৬১টি সোনা, ৫১টি রুপা ও ৪১টি ব্রোঞ্জ নিয়ে প্রথমবারের মতো শীর্ষে ওঠে। এরপর টানা শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে তারা। ১৯৮৬ সালের সিউল গেমসে চীনের মোট পদক দাঁড়ায় ২২২টি। ১৯৯০ সালে বেইজিংয়ে তা বেড়ে হয় ৩৪১। আর ২০১০ সালে গুয়াংজুতে ১৯৯টি সোনা, ১১৯টি রুপা ও ৯৭টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৪১৫টি পদক জিতে এক আসরে ৪০০ পদকের সীমা অতিক্রম করা প্রথম দেশ হয় চীন। ২০২২ সালের হাংঝু এশিয়ান গেমসেও চীন শীর্ষস্থান ধরে রাখে—২০১টি সোনা, ১১১টি রুপা ও ৭১টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৩৮৩টি পদক নিয়ে।

এবার আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসেও সেই আধিপত্য অব্যাহত। ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিযোগিতা শেষে চীনের ঝুলিতে ছিল ১৪৩টি সোনা, ৬২টি রুপা ও ৪৯টি ব্রোঞ্জ—মোট ২৫৪টি পদক। দ্বিতীয় জাপানের মোট পদক ছিল ১৮৩ এবং তৃতীয় দক্ষিণ কোরিয়ার ৯৫।
এই পরিসংখ্যানের এক প্রান্তে ৪১ বছরের শুটার ওয়ান আন্তাও—চীনা দলের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের একজন। অন্য প্রান্তে ২০১৪ সালে জন্ম নেওয়া ছাও শিকি। মাঝখানে রয়েছে এমন এক প্রজন্ম, যাদের মধ্যে ১৩ বছরের ইউ জিডি, ১৫ বছরের ঝু ইউয়ানলিং, ১৬ বছরের চুই চেনেশি কিংবা ১৭ বছরের দ্রুততম মানবী চেন ইউঝির মতো প্রতিভারাও জায়গা করে নিয়েছেন। বয়সে তাঁদের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য নেই, কিন্তু পথটি একই—ছোট বয়সে প্রতিভা শনাক্ত করা, দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে আনা।
চীনের ক্রীড়া সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফেডারেশনগুলোর ভূমিকা। সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় চিহ্নিত করার পর তাঁদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পাঠানো, উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, কোচিং ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া—এসব দায়িত্ব তারা পালন করে। শুরুতে পরিবার বা স্থানীয় পর্যায় থেকে আসা একজন খেলোয়াড় নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছানোর পর জাতীয় কাঠামোর আরও বড় সহায়তা পান। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি যেন একটি দীর্ঘ পাইপলাইন। এক প্রান্তে খেলাধুলায় আগ্রহী শিশু, পরের ধাপে পরিবার ও স্কুল, তারপর স্থানীয় ক্লাব ও ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ, এরপর ফেডারেশন এবং সবশেষে জাতীয় দল ও আন্তর্জাতিক মঞ্চ।
ওয়ান আন্তাওরা সেই দীর্ঘ পথের অভিজ্ঞ প্রতিনিধি। আর ছাও শিকিরা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই শিক্ষার জায়গাটি সবচেয়ে বড়। দেশের তৃণমূলেও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী শিশু-কিশোরের অভাব নেই। কিন্তু প্রতিভা শনাক্তকরণ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং পরিবার-স্কুল-ফেডারেশনের সমন্বিত ব্যবস্থায় এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণও সেই বাস্তবতার একটি চিত্র। বড় একটি ক্রীড়াবহর নিয়ে অংশ নিলেও ধারাবাহিকভাবে পদক জয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি হয়নি। চীনের মতো বিশাল ক্রীড়া ব্যবস্থাকে রাতারাতি অনুসরণ করা সম্ভব নয়। তবে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন, কোচ ও খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং চীনে প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ক্রীড়া সাফল্য কেবল বড় বাজেটের ফল নয়। প্রয়োজন প্রতিভা খুঁজে বের করার ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, দক্ষ কোচ, আধুনিক অবকাঠামো এবং ফেডারেশনের ধারাবাহিক সহায়তা।
ছাও শিকির হাতে স্কেটবোর্ডের চাকা ঘুরছে। ওয়ান আন্তাওদের অভিজ্ঞতা পাশে আছে। আর তাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া-ব্যবস্থা। চীনের এশিয়ান গেমসের সাফল্যের গল্প আসলে সেই ব্যবস্থারই গল্প।