তেজগাঁও কলেজের মসজিদ থেকে আটক ২৩ জনের মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী তৎপরতায় সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ; মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে তথ্য
বাংলাদেশে ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামে একটি সংগঠন গঠনের পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের একটি মসজিদ থেকে আটক ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সংগঠনটির সঙ্গে বিদেশি কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ সম্পর্কে তথ্যলাভের বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘তেজগাঁও হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে সংগঠনটি গঠন করে খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উগ্রবাদী তৎপরতায় যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। সরকার এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার সবধরনের জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ কঠোর হাতে বন্ধ করার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। এ ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স রয়েছে’। তবে প্রস্তাবিত সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো, সদস্যসংখ্যা, অর্থায়নের উৎস এবং বিদেশি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ সম্পর্কে তদন্তের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের একটি মসজিদ থেকে ২৩ জনকে আটক করে পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে কথিত বৈঠক চলার সময় অভিযান চালানো হয় বলে পুলিশ জানায়। পরে আটক ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হেফাজতে নেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০ সেপ্টেম্বর জানান, আটক ২৩ জনের মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে সংগঠন গঠন ও উগ্রবাদী তৎপরতায় সংগঠিত হওয়ার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ১১ জনের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁদের অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তিনি জানান। সংশ্লিষ্ট ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রস্তাবিত সংগঠনটির পরিকল্পনা কত দূর এগিয়েছিল, এর সঙ্গে কারা যুক্ত এবং কোনো দেশি বা বিদেশি নেটওয়ার্কের সহায়তা ছিল কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আটক ব্যক্তিদের ডিজিটাল যোগাযোগ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের নিয়ে উদ্বেগ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে বন্দি পালানোর ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গত ১৮ আগস্ট কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, ওই সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দির মধ্যে ৬৯০ জন তখনো পলাতক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৬৬ জনের পরিচয় বা অবস্থান সম্পর্কে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য ছিল না; তাঁরা সবাই নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন।
কারা মহাপরিদর্শকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে জঙ্গি মামলার আসামিও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তিনজন তখনো পলাতক ছিলেন।
তবে কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের সঙ্গে ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ গঠনের পরিকল্পনার কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দুটি ঘটনাকে একই নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দেখার আগে তদন্তের ফলাফল জানা প্রয়োজন।
উগ্রবাদ নিয়ে পুরোনো উদ্বেগ, নতুন করে নজরদারির প্রশ্ন
বাংলাদেশে উগ্রবাদী তৎপরতা মোকাবিলা, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং সম্ভাব্য সংগঠনগুলোর অর্থায়ন ও যোগাযোগের উৎস অনুসন্ধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। তেজগাঁওয়ের ঘটনা সেই নজরদারি ও তদন্তের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেছেন, বাংলাদেশে উগ্রবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়; দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গত প্রায় দুই বছরে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড কতটা কার্যকরভাবে নজরদারিতে ছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কিছু গোষ্ঠীর নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টার আলামত দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে অন্তত ৬৯০ বন্দি পালিয়ে যান। তাঁদের মধ্যে জঙ্গিবাদের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পালিয়ে যাওয়া কয়েকজন বন্দিকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তিনজনের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। তবে পলাতক বন্দিদের সঙ্গে নতুন সংগঠনটির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
এ ছাড়া, চট্টগ্রামের একটি বিমানঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক ওয়ারেন্ট অফিসারকে পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি স্থানে পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্রপন্থি নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে তদন্তের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের হালনাগাদ তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উগ্রবাদী তৎপরতা প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
এদিকে ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর ও মধ্য বাড্ডায় একাধিক বাসে আগুন এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে পুলিশের জব্দ করা একটি পিকআপে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে। একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের খবরও প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনায় কারা জড়িত এবং ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই এসব ঘটনাকে তেজগাঁওয়ের আটক ব্যক্তিদের কথিত পরিকল্পনা কিংবা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
উগ্রবাদী সংগঠন গঠনের পরিকল্পনার অভিযোগ সত্য হলে তা দেশের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে অভিযোগের পাশাপাশি তদন্তে পাওয়া প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামে সংগঠন গঠনের পরিকল্পনা কতটা বাস্তব ছিল, এর সম্ভাব্য সদস্য ও যোগাযোগের পরিধি কতটুকু এবং বিদেশি কোনো গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে চলমান তদন্তের ওপর।