রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় আবারও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে জড়িয়েছেন ঢাকা কলেজ ও ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা। গত বছরের নভেম্বরে দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আর মারামারি না করার মৌখিক ‘শান্তিচুক্তি’ হয়েছিল। সেই সমঝোতার প্রায় ১০ মাস পর রোববার দুপুরে আবারও দুই পক্ষ মুখোমুখি হলো।
রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে সায়েন্স ল্যাব মোড়সংলগ্ন গ্রিন রোডের দক্ষিণ প্রান্তে দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। এতে কিছু সময়ের জন্য সায়েন্স ল্যাব মোড় দিয়ে গণপরিবহনসহ যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ ও শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিউমার্কেট জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার শওকত আলী বলেন, ঢাকা কলেজের কিছু শিক্ষার্থী আইডিয়াল কলেজের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশ ও শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার সময় বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ হয়নি এবং পুলিশের কাছে আহত হওয়ার নিশ্চিত তথ্যও পাওয়া যায়নি।
তবে দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আহত হওয়ার ভিন্ন দাবি পাওয়া গেছে। ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সায়েন্স ল্যাব দিয়ে ঢাকা কলেজের একটি বাস যাওয়ার সময় ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে সেটিতে আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল ছুড়েছেন—এমন খবর পান তাঁরা। এরপর দুপুর ১২টার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী আইডিয়াল কলেজের দিকে যান। তাঁর দাবি, ইটপাটকেলের আঘাতে বাসটির জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং পরে আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের হামলায় ঢাকা কলেজের তিনজন শিক্ষার্থী আহত হন।
অন্যদিকে, আইডিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থীর দাবি, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা অকারণে তাঁদের ওপর হামলা করতে এসেছিলেন। এতে তাঁদের কলেজের পাঁচজনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে এসব আহতের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।
দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণ কী—এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যও স্পষ্ট নয়। অতীতে এ দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে এসব ঘটনার পেছনে তুচ্ছ বিষয়, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ কিংবা তাৎক্ষণিক উত্তেজনাকে কারণ হিসেবে পেয়েছেন। আজকের ঘটনাতেও ঠিক কোন ঘটনা থেকে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছে, তা তদন্তের আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে দুই কলেজের মধ্যে এ ধরনের সংঘর্ষ নতুন নয়। গত বছর ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর অন্তত ১৫ বার এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। সংঘর্ষের কারণে শিক্ষার্থীরা আহত হওয়ার পাশাপাশি সায়েন্স ল্যাব, গ্রিন রোড ও নিউমার্কেট এলাকায় যান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বছরের ৯ নভেম্বর নিউমার্কেট থানা-পুলিশের মধ্যস্থতায় ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি মৌখিক শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল। ঢাকা কলেজে অনুষ্ঠিত ওই সমঝোতায় দুই পক্ষ আর মারামারিতে না জড়ানোর অঙ্গীকার করে। শিক্ষার্থীরা তখন ‘আমরা সবাই ভাই ভাই, আমাদের মাঝে বিরোধ নাই’ স্লোগানও দেন। দীর্ঘমেয়াদে সংঘর্ষ ঠেকাতে দুই কলেজের শিক্ষক ও পুলিশের প্রতিনিধিদের নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল।
সেই সমঝোতার পরও পরে আবার দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর ফলে শুধু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নয়, সায়েন্স ল্যাব ও গ্রিন রোডের মতো ব্যস্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, দুই কলেজের বিরোধের পেছনে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক উত্তেজনা কাজ করে। পুরোনো কোনো ঘটনা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক থেকেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। তবে রোববারের ঘটনায় ঠিক কোন বিষয়টি সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা যাতে আবার বড় সংঘর্ষে রূপ না নেয়, সে জন্য ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি রাখা হচ্ছে।