দুই বছর পর আবারও বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মুখরিত হলো তিতাস নদী। শরতের পড়ন্ত বিকেলে নদীর দুই তীরে নামে মানুষের ঢল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বর্ণাঢ্য নৌকা বাইচ ঘিরে উৎসবে মেতে ওঠেন জেলার মানুষ। প্রতিযোগিতা দেখতে দুপুরের আগ থেকেই নদীর তীরে জড়ো হতে থাকেন দর্শনার্থীরা। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিমরাইলকান্দি থেকে মেড্ডা পর্যন্ত তিতাসের দুই পাড় লোকারণ্য হয়ে ওঠে।
শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এ নৌকা বাইচের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, নৌকা বাইচের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া দেশের একটি সাংস্কৃতিক রাজধানী। তিনি বলেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও এখানকার সংস্কৃতি নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। নৌকা বাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই ধারণার জবাব দেওয়া সম্ভব। খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, “এই নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটা সাংস্কৃতিক রাজধানী। নৌকা বাইচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যেরই অংশ। মানুষ চায় প্রতিবছর নৌকা বাইচ হোক। আমরা আশা করি, আগামী বছর থেকে নিয়মিতভাবে এটি আয়োজন করতে পারব।”
জেলা শহরের শিমরাইলকান্দি থেকে মেড্ডা এলাকার নদীপথে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নয়টি নৌকা চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেয়। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতা অতীতে নিয়মিত আয়োজন করা হলেও গত দুই বছর তা বন্ধ ছিল। দুই বছর বিরতির পর আবার আয়োজন হওয়ায় এবার দর্শনার্থীদের আগ্রহও ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তবে এর অনেক আগেই নদীর দুই তীরে ভিড় করতে থাকেন মানুষ। একপর্যায়ে নদীর পাড় ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক ও খোলা জায়গাতেও মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে। অনেক দর্শনার্থী আবার নির্দিষ্ট নৌকার সমর্থনে স্লোগান ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
প্রতিযোগিতায় সদর উপজেলার ক্ষমতাপুর গ্রামের শাপলা বয়েজ ক্লাবের নৌকা প্রথম স্থান অর্জন করে। পরে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিজয়ী দলের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। নৌকা বাইচ দেখতে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন গ্রিসপ্রবাসী সোহাগ মিয়া। তিনি বলেন, নৌকা বাইচ তাঁদের কাছে শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি প্রাণের উৎসব। সোহাগ মিয়া বলেন, “আমি ঢাকায় ছিলাম। বাইচ দেখতে সকালে অনেক কষ্ট করে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসেছি। নদীর দুই পাড়ে মানুষের উচ্ছ্বাসই প্রমাণ করে, এটি আমাদের প্রাণের উৎসব। সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে এই আনন্দ উৎসবে এসে।”
আরেক দর্শনার্থী মার্জান ভুঁইয়া বলেন, নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে তিতাস নদীর পাড়ের মানুষের মধ্যে আনন্দের জোয়ার নেমেছে। পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “আমরা আনন্দিত। আমরা চাই, প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হোক।”
জেলা প্রশাসনও আগামী বছর থেকে আরও বড় পরিসরে নৌকা বাইচ আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, “নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা এখানকার মানুষের প্রাণের উৎসব। আগামী বছর থেকে আরও জমজমাটভাবে এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হবে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে তিতাস নদীর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। নৌকা বাইচ সেই ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ জনপদে বর্ষা ও শরতের মৌসুমে নৌকা বাইচ একসময় ছিল নিয়মিত উৎসবের অংশ। সময়ের সঙ্গে নানা কারণে এ ধরনের আয়োজন কমে গেলেও স্থানীয় মানুষের আগ্রহ এখনো অটুট।
এবারের আয়োজন সেই আগ্রহেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, নিয়মিত নৌকা বাইচ হলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে জেলার সাংস্কৃতিক পরিচিতি দেশজুড়ে তুলে ধরতেও এমন আয়োজন ভূমিকা রাখতে পারে।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রঞ্জন চন্দ্র দে, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মোবারক হোসেন, জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জহিরুল হক এবং সাবেক সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লাসহ প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
দুই বছর পর তিতাসের বুকে বৈঠার ছন্দে ফিরে আসা এই নৌকা বাইচ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতাই ছিল না; স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ছিল হারিয়ে যেতে বসা একটি ঐতিহ্য ও লোকউৎসবের পুনরাগমন। বিপুল মানুষের উপস্থিতি এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আয়োজকেরা এখন নিয়মিতভাবে এই উৎসব আয়োজনের প্রত্যাশা করছেন।