ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের চান্দেরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত বাংলাদেশি যুবক আসাদুল হকের মরদেহ প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে পীরগঞ্জ উপজেলার জিনাজপুর বিওপির আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় বিজিবির কাছে মরদেহটি হস্তান্তর করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। নিহত আসাদুল হক (৩৮) পীরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ ইন্দ্রইল গ্রামের আব্দুল ওয়াজেদের ছেলে।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে চান্দেরহাট সীমান্তের ৩৩৩ নম্বর পিলারের কাছে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টার সময় বিএসএফের গুলিতে আসাদুলসহ তিন বাংলাদেশি আহত হন। পরে বিএসএফ সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে ভারতের উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে আসাদুলের মৃত্যু হয়।
আহত অপর দুজন হলেন পীরগঞ্জ উপজেলার উত্তর ইন্দ্রইল গ্রামের আহেদ আলীর ছেলে মোস্তাকিম ও নারায়ণের ছেলে শ্রী উদা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁদেরও কালিয়াগঞ্জ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
সীমান্তে গুলিতে তিনজন আহত
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোররাতে সীমান্ত পিলার ৩৩৩-এর কাছে ভারতের উত্তর দিনাজপুরের ৬৩ নম্বর চকশিবানন্দ বিএসএফ ক্যাম্পের একটি টহলদল বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তিনজন আহত হন। পরে তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আসাদুল হককে মৃত ঘোষণা করেন।
ভারতীয় সাংবাদিক রাধা রানী হালদার ঠাকুর ও ভাস্কর রায় বিএসএফ ও কালিয়াগঞ্জ থানা পুলিশের বরাত দিয়ে জানান, ভোররাতে ৬ থেকে ৭ জন বাংলাদেশি মই ব্যবহার করে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। এ সময় বিএসএফ সদস্যরা গুলি ছোড়েন। এতে তিনজন আহত হন। পরে তাঁদের কালিয়াগঞ্জ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে আসাদুলকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
তবে সীমান্তে গুলির পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশিদের ভারতে প্রবেশের চেষ্টার বিষয়ে বিজিবি বা বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো পৃথক বিবরণ পাওয়া যায়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আসাদুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে তা বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্যদিকে আহত দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। তাঁদের রায়গঞ্জ মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন।
পতাকা বৈঠকের পর মরদেহ হস্তান্তর
আসাদুল হকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সীমান্তবর্তী এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে রোববার দুপুরে চান্দেরহাট সীমান্তের শূন্যরেখায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে দিনাজপুর ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসানসহ বিজিবির কর্মকর্তারা অংশ নেন। বিএসএফের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে আসাদুল হকের মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়। পরে ভারতের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে রোববার রাত ১০টার দিকে মরদেহটি বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে বিএসএফ। এরপর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
দিনাজপুর ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁরা ঘটনাটি জানতে পারেন। নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে রোববার রাত ১০টার দিকে বিএসএফ আসাদুলের মরদেহ ফেরত দিয়েছে।
সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় আবারও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অনুপ্রবেশ এবং সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে আহত দুই বাংলাদেশিকে ভারতে আটকের পর তাঁদের বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়টিও এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে।