৯০ মিনিট ধরে একাই দুর্গ রক্ষার শেষ প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তার অবিশ্বাস্য সব সেভে বারবার হতাশ হয়েছে স্পেন, আর ১০ জনের আর্জেন্টিনাও বাঁচিয়ে রেখেছিল শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন। মনে হচ্ছিল, আরেকবার হয়তো বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁয়ে দেখবেন লিওনেল মেসি। কিন্তু ফুটবল শেষ পর্যন্ত হাসল স্পেনের দিকেই। নির্ধারিত সময়ের খেলা গোলশূন্যতে শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর মাত্র ৩৭ সেকেন্ড পর ফেরান তোরেসের অসাধারণ ফিনিশিং ভেঙে দেয় আর্জেন্টিনার সব স্বপ্ন। সেই একমাত্র গোলেই ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি নিজেদের করে নিল লা রোহারা।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আসে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করা মুহূর্তটি। ডান প্রান্ত দিয়ে দারুণ এক আক্রমণের সূচনা করেন পেদ্রো পোরো। তার নিখুঁত ক্রস দূরের পোস্টে কোনোভাবে খেলায় রাখেন নিকো উইলিয়ামস। ফিরতি হেড থেকে বক্সের ভেতরে পাওয়া বল জোরালো শটে জালে জড়িয়ে দেন ফেরান তোরেস। গোল হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়াম, আর স্তব্ধ হয়ে যায় আর্জেন্টিনার শিবির।
এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অসাধারণ লড়াই, ১০ জনের আর্জেন্টিনার অদম্য প্রতিরোধ- সবকিছুর পরও শেষ হাসিটা হাসল স্পেনই। চারদিক লাল উল্লাসে রাঙিয়ে লা রোহারা আবারও উঠল বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সিংহাসনে।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে ছিল আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের রোমাঞ্চকর লড়াই। মাত্র পঞ্চম মিনিটেই এগিয়ে যাওয়ার দারুণ সুযোগ পেয়েছিল স্পেন। লামিন ইয়ামালের ক্রস ডিফ্লেক্ট হয়ে দানি ওলমোর কাছে যায়। ওলমো চমৎকারভাবে বল ফেরত দিলে ইয়ামাল শট নেন, তবে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় বল জালে জড়াতে পারেনি।
এর কিছুক্ষণ পরই আর্জেন্টিনাও সুযোগ তৈরি করে। সপ্তম মিনিটে লিওনেল মেসি গোলের সম্ভাবনা তৈরি করলেও স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন দ্রুত এগিয়ে এসে দারুণ দক্ষতায় বিপদ সামাল দেন।
প্রথম ২০ মিনিটের পর থেকেই স্পেন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। বল দখল, পাসিং ও আক্রমণে তারা ছিল স্পষ্টভাবে এগিয়ে। প্রথম ২৩ মিনিটে আর্জেন্টিনা মাত্র ৩২ শতাংশ বল দখলে রাখতে পারে। মেসি, নিকো গঞ্জালেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ—এই তিন ফরোয়ার্ড মিলে তখন পর্যন্ত মাত্র ১৭ বার বলে স্পর্শ করেছিলেন।
স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি পুরো মাঠজুড়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স উপহার দেন। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজনে তৃতীয় সেন্টার-ব্যাকের ভূমিকাও পালন করেন তিনি। তার নেতৃত্বে স্পেন বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে।
৩৯ মিনিটে স্পেনের আরেকটি দারুণ আক্রমণ প্রতিহত করেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। লাপোর্তে, রদ্রি ও বায়েনার দুর্দান্ত সমন্বয়ের পর ফাবিয়ানের পাস থেকে ওয়ারজাবালের জোরালো শট নিচে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক।
৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। ইনজুরির কারণে দুই মিনিট পরই তাকে মাঠ ছাড়তে হয় এবং বদলি হিসেবে নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি।
প্রথমার্ধে বল দখলে স্পেন ছিল ৬৫ শতাংশে, যেখানে আর্জেন্টিনা মাত্র ৩৫ শতাংশ। স্পেন লক্ষ্যে দুটি শট নিতে পারলেও আর্জেন্টিনা পুরো প্রথমার্ধে লক্ষ্যে একটি শটও রাখতে পারেনি। পাসিংয়েও স্পেন ছিল অনেক এগিয়ে—৩১৩টি সফল পাসের বিপরীতে আর্জেন্টিনার ছিল মাত্র ১৫৫টি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই লিওনেল স্কালোনি পরিবর্তন এনে নিকো গঞ্জালেজের পরিবর্তে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে মাঠে নামান। তবে মাঠে নেমেই পারেদেস রদ্রিকে পেছন থেকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন।
৫৫ মিনিটে শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত ট্যাকলে স্পেনের নিশ্চিত গোল রুখে দেন ওতামেন্দি। এরপরও আক্রমণের ধার বজায় রাখে স্পেন। ৬২ মিনিটে কোচ দুটি পরিবর্তন এনে ফাবিয়ানের বদলে পেদ্রি এবং ওয়ারজাবালের বদলে ফেরান তোরেসকে মাঠে নামান।
কিছুক্ষণ পর ইয়ামালের দারুণ ক্রস থেকে তোরেস হেড নিলেও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ সহজেই বল ধরে ফেলেন। ম্যাচের ৭০ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি, যা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপ ফাইনালে বিরল এক পরিসংখ্যান।
পরবর্তীতে স্কালোনি আরও পরিবর্তন এনে রদ্রিগো দে পলের জায়গায় জিউলিয়ানো সিমিওনে এবং ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে ফাকুন্দো মেদিনাকে নামান। অন্যদিকে স্পেনও ওলমো ও বায়েনার পরিবর্তে মিকেল মেরিনো ও নিকো উইলিয়ামসকে মাঠে পাঠায়।
শেষ দিকে স্পেন একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ অসাধারণ গোলকিপিংয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। পেদ্রি, ইয়ামাল, কুবার্সি ও লাপোর্তের একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন তিনি।
নির্ধারিত সময়ের ইনজুরি টাইমে উইলিয়ামসের শক্তিশালী শটও রুখে দেন মার্টিনেজ। একই সময়ে কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। শেষ মুহূর্তে ইয়ামালের ফ্রি-কিকও অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক।
তবে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে আর স্পেনকে আটকানো যায়নি। ১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামস বাম দিক থেকে নিখুঁত পাস বাড়ান ফেরান তোরেসের উদ্দেশে। বদলি এই ফরোয়ার্ড ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে দেন এবং তাতেই নিশ্চিত হয় স্পেনের বিশ্বকাপ জয়।
পুরো ম্যাচে বল দখল, পাসিং, আক্রমণ ও সুযোগ সৃষ্টিতে আধিপত্য দেখিয়েছে স্পেন। অন্যদিকে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অসাধারণ পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় লড়াইয়ে রাখলেও শেষ পর্যন্ত ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলেই বিশ্বকাপের শিরোপা উড়ে যায় স্পেনের হাতে।