ডারউইনে বাংলাদেশকে ডাকছে ইতিহাস

ক্রীড়া প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ইনিংস পরাজয় এড়াতে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন আরও ৬৭ রান, হাতে ৬ উইকেট। স্মরণীয় এক জয় থেকে মাত্র এক দিনের দূরত্বে বাংলাদেশ

ডারউইনে ইতিহাসের দরজা এখন বাংলাদেশের সামনে। দরজাটি খুলতে বাকি আর সামান্য পথ। তিন দিন ধরে যেভাবে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রেখেছে বাংলাদেশ, তাতে এখন আর শুধু ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনা নয়—আলোচনায় উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্মরণীয় এক টেস্ট জয়ের সম্ভাবনাও।

তৃতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের সংগ্রহ ৪ উইকেটে ১৬১ রান। ইনিংস পরাজয় এড়াতে তাদের প্রয়োজন আরও ৬৭ রান। হাতে রয়েছে ছয়টি উইকেট। অর্থাৎ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এখনো বাংলাদেশের হাতেই।

তবে টেস্ট ক্রিকেটে শেষ দিনের হিসাব কখনোই সরল নয়। অস্ট্রেলিয়ার হাতে এখনও ব্যাটসম্যান আছে, উইকেটও ব্যাটিংয়ের জন্য যথেষ্ট ভালো। ফলে বাংলাদেশের সামনে যেমন ইতিহাসের হাতছানি, তেমনি অপেক্ষা করছে শেষ প্রতিরোধের কঠিন পরীক্ষা।

তৃতীয় দিনের সবচেয়ে বড় নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। বাংলাদেশের ইনিংস যখন শেষ প্রান্তে, তখন লোয়ার অর্ডারকে সঙ্গে নিয়ে অসাধারণ দৃঢ়তায় ব্যাট করেন তিনি। সাত নম্বরে নেমে ১৫৪ বলে ৬৫ রান করেন মিরাজ। তাঁর ইনিংসটি শুধু ব্যক্তিগত অর্ধশতক নয়; বাংলাদেশের লিডকে ২২৮ রানে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

সকালে ৬ উইকেটে ৩৫১ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করেছিল বাংলাদেশ। হাসান মাহমুদ ১৪ রান করে বিদায় নেন। কিন্তু ৯২ বল খেলে ১৬৩ মিনিট ক্রিজে থেকে তিনি যে প্রতিরোধ গড়ে দিয়েছিলেন, সেটি মিরাজকে সময় দিয়েছে।

তাইজুল ইসলামের ১৭ রান এবং তাসকিন আহমেদের সঙ্গে মিরাজের ৪৬ রানের নবম উইকেট জুটি বাংলাদেশের লিড আরও বাড়িয়ে দেয়।

অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা যখন লেজের ব্যাটসম্যানদের দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, মিরাজ তখন স্ট্রাইক ধরে রেখে, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রান্ত বদলে এবং ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে রান তুলেছেন। বাউন্সারের কৌশলও খুব একটা কাজে আসেনি।

শেষ পর্যন্ত মিরাজকে ফিরিয়ে বাংলাদেশের ইনিংস থামান জশ হেইজেলউড। ৪২৬ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ।

বিশাল লিড পাওয়ার পর বাংলাদেশ বল হাতেও শুরুটা করে দুর্দান্ত। হাসান মাহমুদের প্রথম ওভারেই জেইক ওয়েদেরল্ড নিজের স্টাম্পে বল টেনে এনে শূন্য রানে ফেরেন। এরপর বিপজ্জনক ট্রাভিস হেডকেও একই ধরনের ভুলে ফিরিয়ে দেন হাসান। মার্নাস লাবুশেন কিছুটা স্বচ্ছন্দে খেলছিলেন। স্টিভেন স্মিথও ছিলেন সেট। দুজন মিলে অস্ট্রেলিয়াকে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। সেখানেই আঘাত করেন তাইজুল ইসলাম। বৈচিত্র্যময় গতি ও আক্রমণাত্মক লেংথে লাবুশেনকে বোল্ড করেন তিনি। এরপর স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিনের জুটিও জমে উঠছিল। কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজ আবারও বাংলাদেশের ত্রাতা। স্মিথকে চাপে রেখে শেষ পর্যন্ত ভুল শট খেলতে বাধ্য করেন তিনি। ৪৪ রান করে মিরাজের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক।

স্মিথের উইকেটটি বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি উইকেট নয়; ম্যাচের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি সরিয়ে দেওয়া।

দিন শেষে ক্যামেরন গ্রিন ৪৩ এবং অ্যালেক্স কেয়ারি ২৩ রানে অপরাজিত। তাদের জুটি ভাঙতে পারলেই অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডার সামনে আসবে। এরপর ওয়েস্টারসহ বাকি ব্যাটসম্যানদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে লড়তে হবে।

বাংলাদেশের সামনে তাই কাজটি স্পষ্ট—প্রথমে দ্রুত এই জুটি ভাঙা, এরপর অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডারকে চাপে ফেলা।

Cameron Green and Alex Carey guided Australia to the close, Australia vs Bangladesh, 1st Test, Darwin, 3rd day, August 15, 2026

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার সামনে একটাই লক্ষ্য—কোনোভাবে আরও ৬৭ রান করে ইনিংস পরাজয় এড়ানো।

অস্ট্রেলিয়ার ঘরের মাঠে এত বড় লিড নিয়ে কখনো টেস্ট হারেনি অস্ট্রেলিয়া। ফলে শেষ দিনে তাদের শুধু বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হবে না, মোকাবিলা করতে হবে নিজেদের ইতিহাসকেও।

তাদের সামনে সুযোগ এমন এক জয় তুলে নেওয়ার, যা দেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিতে পারে। তিন দিন ধরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে। ব্যাট হাতে ২২৮ রানের লিড, বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার চার উইকেট—সব মিলিয়ে ডারউইনে এখন সম্ভাবনার পাল্লা বাংলাদেশের দিকেই ভারী।

তবে ইতিহাসের দরজা পর্যন্ত পৌঁছানো আর দরজা খুলে ভেতরে ঢোকা এক কথা নয়। শেষ দিনের প্রথম ঘণ্টাই হয়তো বলে দেবে—ডারউইনে বাংলাদেশ শুধু একটি টেস্ট জিতবে, নাকি লিখবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।

হেজেলউডের প্রত্যাবর্তন, তবু বাংলাদেশের দিন
অস্ট্রেলিয়ার জন্য দিনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি অবশ্যই হেজেলউডের বোলিং। ১৩ মাস পর টেস্ট ক্রিকেটে ফিরে তিনি নিয়েছেন ছয় উইকেট। মিরাজকে আউট করার সময়ই পূর্ণ করেন টেস্টে ৩০০ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার নবম বোলার হিসেবে এই মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।

আরও বিস্ময়কর বিষয়, এই টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার একাদশে থাকা চার বোলারেরই টেস্ট উইকেটসংখ্যা ৩০০ বা তার বেশি। স্টার্ক, কামিন্স, লায়ন ও হেইজেলউড—টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে একই একাদশে এমন চারজন বোলারের উপস্থিতি বিরল। এই চারজনের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৪২৬ রান করার কৃতিত্ব তাই আরও বড় হয়ে ওঠে।


সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস:
১৯৮

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ১৩৮ ওভারে ৪২৬ (আগের দিন ৩৫১/৬) ((মিরাজ ৬৫, হাসান ১৪, তাইজুল ১৭, তাসকিন ১৪*, ইবাদত ৭; স্টার্ক ২৬-৩-৭৯-২, হেইজলেউড ২৮-৩-৮৯-৬, গ্রিন ১০-২-৩৪-০, কামিন্স ২৭-৪-৭৫-১, লায়ান ৩১-৪-১০২-১, ওয়েবস্টার ১০-১-২৮-০, হেড ২-০-৩-০, লাবুশেন ৪-১-৪-০)।

অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: ৫৩ ওভারে ১৬১/৪ (হেড ১৭, ওয়েদেরল্ড ০, লাবুশেন ৩১, স্মিথ ৪৪, গ্রিন ৪৩*, কেয়ারি ২৩*; তাসকিন ১২-৩-৩৮-০, হাসান ১১-২-৩৩-২, ইবাদত ৮-০-৩৮-০, তাইজুল ৯-০-২৮-১, মিরাজ ১৩-৪-২০-১

এলাকার খবর

সম্পর্কিত