রাজনৈতিক বৈরিতা, যুদ্ধের ইতিহাস, ১৮০৬ ও ১৮০৭ সালে ব্রিটিশদের আর্জেন্টিনা আক্রমণ, দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ কিংবা ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড। সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার দ্বৈরথ ফুটবল বিশ্বের অন্যতম তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তবে এই উত্তেজনার মাঝেও দুই দেশের ফুটবলাররা স্বীকার করেন, মাঠে একে অপরের বিপক্ষে খেলাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও রোমাঞ্চ।
ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আগামী বুধবার মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। আরেকটি ম্যাচ যখন দরজায় টোকা দিচ্ছে তখন পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীতাগুলো সামনে আসছে। উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঝাঁঝ ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইংলিশ গণমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ান ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার হট থ্রিলার লড়াইগুলো নিয়ে এক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। যেখানে ঘটনাবহুল ম্যাচগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তৃতভাবে।
এই লড়াইকে অনেকেই ‘একমাত্র আন্তঃমহাদেশীয় ডার্বি’ বলে অভিহিত করেন। রাজনীতি, ইতিহাস ও ফুটবল সবকিছু মিলিয়ে ম্যাচটিতে গড়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দিবতা।তাই লড়াইটা হয়ে উঠে ঝাঁঝালো।
বর্তমানে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কোচ ডিয়েগো সিমিওনে একসময় ছিলেন ইংল্যান্ডের ‘কুখ্যাত’ প্রতিপক্ষ। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে বেকহ্যামের সামান্য লাথিকে বড় করে দেখিয়ে মাঠে পড়ে যান তিনি। সেই ঘটনায় লাল কার্ড দেখেন বেকহ্যাম, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
২০০২ সালে এক সাক্ষাৎকারে সিমিওনে বলেছিলেন, ‘আমি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে ভালোবাসি। তাদের ফুটবল সবসময় খোলামেলা, আক্রমণাত্মক ও আবেগপূর্ণ। আপনি জিতবেন নয়তো হারবেন। কিন্তু ম্যাচ খেলে আপনার অনুভব হবে সত্যিকারের একটি লড়াই হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ১৯৯১ সালে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম খেলতে নেমে স্টুয়ার্ট পিয়ার্সের ট্যাকলে পায়ে যে দাগ পড়েছিল, সেটি এখনও বহন করছেন তিনি।
১৯৯৮: বেকহ্যামের লাল কার্ড, ওয়েনের বিস্ময়
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের সেই ম্যাচটি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় লড়াই হিসেবে বিবেচিত হয়। বেকহ্যামের লাল কার্ডের পরও ১০ জনের ইংল্যান্ড দারুণ লড়াই করেছিল।
সিমিওনে পরে স্বীকার করেন, ‘এটি আমার খেলা সেরা আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ইংল্যান্ড সেদিন অসাধারণ খেলেছিল। অ্যালান শিয়ারার ও পল ইনস ছিলেন দুর্দান্ত। ১০ জন নিয়ে ৭০ মিনিট খেলা সহজ নয়।’
বেকহ্যামের সমালোচনার প্রসঙ্গে সিমিওনের মন্তব্য ছিল, ‘সব দোষ শুধু ডেভিডের ছিল না। রেফারিও ছিলেন। সে ভুল করেছিল, কিন্তু এত সমালোচনা তার প্রাপ্য ছিল না।’
অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের সাবেক কোচ গ্লেন হডল সেই ম্যাচে ১৮ বছর বয়সী মাইকেল ওয়েনের দুর্দান্ত গোলকে এখনও ভুলতে পারেন না। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একক প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভেঙে গোল করেছিলেন ওয়েন। যা এখনও বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়।
ওয়েনও পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘প্রথম টাচ নেওয়ার পর মাথা তুলে দেখি সামনে গোলের সুযোগ। তখন শুধু সঠিক সময়ে শট নেওয়ার কথাই ভাবছিলাম।’ সিমিওনে স্বীকার করেছিলেন, ‘ওয়েন আমাদের জন্য বড় চমক ছিল। তার সম্পর্কে আমরা তেমন কিছুই জানতাম না।’
বিতর্ক, নাটক আর পেনাল্টি হার
সেই ম্যাচে সল ক্যাম্পবেলের করা একটি গোল ফাউলের অভিযোগে বাতিল হয়। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা গোল উদযাপন করলেও খেলা চলতে থাকায় আর্জেন্টিনা পাল্টা আক্রমণে উঠে যায়। ঘটনাটি আজও ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়।
শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে নিজেদের ঐতিহাসিক প্রতিপক্ষকে হারানোর আনন্দে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। সিমিওনে বলেন, ‘ইংল্যান্ডকে হারানো, বিশেষ করে দুই দেশের ইতিহাস বিবেচনায়, আমাদের জন্য ছিল বিশাল আনন্দের।’
২০০২-এ ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ
২০০২ বিশ্বকাপে জাপানের সাপ্পোরোতে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। মাইকেল ওয়েনের আদায় করা পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোল করেন ডেভিড বেকহ্যাম। সেই ফাউলটি করেছিলেন বর্তমান কোচ মরিসিও পোচেত্তিনো। পোচেত্তিনো পরে মজা করে বলেছিলেন, ‘ওটা অবশ্যই ডাইভ ছিল।’
তবে ওয়েন স্বীকার করেন, ‘আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম। ডিফেন্ডার আমাকে আঘাত করেছিল, পায়েও কেটে গিয়েছিল, কিন্তু চাইলে পড়ে না গিয়েও খেলতে পারতাম।’
‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একই ম্যাচে করা তার দ্বিতীয় গোলটিকেই ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোলগুলোর একটি ধরা হয়।
সিমিওনে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘হ্যান্ড অব গড গোলের সময় বাবা বলেছিলেন এটা হ্যান্ডবল। কিন্তু আমি বলেছিলাম, না এটা বৈধ গোল। আসলে তখন আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে দ্বিতীয় গোলটি প্রমাণ করে দিয়েছিল, ম্যারাডোনাই বিশ্বের সেরা ফুটবলার।’
সিমিওনের মতে, আর্জেন্টিনার ফুটবলের মূল দর্শনই আলাদা। তিনি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় রাস্তায় খেলাকে ফুটবল বলতাম না, বলতাম ‘হুগার আ লা পেলোতা’-অর্থাৎ বল নিয়ে খেলা। এর মানে ড্রিবল করা, প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ওঠা, নিজের দক্ষতা দেখানো। ম্যারাডোনার সেই শতাব্দীর সেরা গোল ছিল ‘হুগার আ লা পেলোতা’র নিখুঁত উদাহরণ।’