এক সময় বিশ্ব ফুটবলের মানদণ্ড ছিল ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা ইতালি। পরে সেই তালিকায় যোগ হয় স্পেন। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ইউরো–বিশ্বকাপ–ইউরো জিতে ফুটবলের ইতিহাসে অনন্য এক যুগের সূচনা করেছিল লা রোজা। কিন্তু সেই সোনালি প্রজন্মের বিদায়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন স্পেনের আধিপত্য বুঝি শেষ। বাস্তবতা বলছে ঠিক উল্টোটা।
২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে স্পেন প্রমাণ করেছে, তাদের সাফল্য কোনো এক প্রজন্মের কীর্তি নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ফুটবল ব্যবস্থার ফল। আরও অবাক করার বিষয় হলো, শুধু পুরুষ দল নয়—নারী ফুটবল, বয়সভিত্তিক দল এবং অলিম্পিক মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে স্পেন জিতেছে ১৬টি আন্তর্জাতিক শিরোপা। বিশ্বের আর কোনো দেশ বর্তমানে এমন ধারাবাহিক আধিপত্য দেখাতে পারেনি।
সাফল্যের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল কবে
বিশ্বকাপের ট্রফি জেতা শুরু হয় না ফাইনালের ৯০ মিনিটে। এর শুরু হয় একাডেমিতে, প্রশিক্ষণ মাঠে, বয়সভিত্তিক দলে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়।
স্পেন গত দুই দশকে একটি বিষয় কখনো বদলায়নি—তাদের ফুটবল দর্শন। বয়সভেদে কোচ আলাদা হলেও খেলার ধরণ প্রায় একই। অনূর্ধ্ব-১৫ দল থেকে সিনিয়র দল পর্যন্ত সবাই বল দখলে রেখে আক্রমণ গড়া, দ্রুত পাস, পজিশনাল ফুটবল এবং টেকনিক্যাল দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেয়।
ফলে একজন ফুটবলার যখন জাতীয় দলের মূল দলে ওঠেন, তখন নতুন কোনো দর্শন শেখার প্রয়োজন হয় না। তিনি সেই ব্যবস্থারই ধারাবাহিক অংশ হয়ে ওঠেন।
পুরো দেশই এখন একাডেমি
অনেকেই স্পেনের সাফল্যকে শুধু বার্সেলোনার লা মাসিয়ার কৃতিত্ব বলে মনে করেন। বাস্তবে চিত্রটা অনেক বড়। রিয়াল মাদ্রিদ, অ্যাথলেটিক বিলবাও, রিয়াল সোসিয়েদাদ, ভিয়ারিয়াল, ভ্যালেন্সিয়া, সেভিয়া—প্রায় প্রতিটি বড় ক্লাবই নিয়মিত আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার তৈরি করছে।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের লামিন ইয়ামাল, পাউ কুবারসি, গাভি, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি, মার্টিন সুবিমেন্দি কিংবা দানি ওলমো—সবার বেড়ে ওঠার পথ আলাদা হলেও তাদের ফুটবল শিক্ষার ভিত্তি একই দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে।
দে লা ফুয়েন্তের সাফল্য
২০২২ বিশ্বকাপে হতাশাজনক বিদায়ের পর লুইস এনরিকেকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে। তখন সিদ্ধান্তটি অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়কর। কারণ তিনি কখনো বড় কোনো ক্লাবের কোচ ছিলেন না। কিন্তু স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন তার মধ্যে দেখেছিল অন্য কিছু।
অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ ও অলিম্পিক দলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি এই প্রজন্মের অধিকাংশ ফুটবলারের সঙ্গে বহু বছর কাজ করেছেন। ফলে সিনিয়র দলে এসে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়নি।
বিশ্বকাপ, ইউরো ও নেশনস লিগ জয়ের পেছনে তার সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত কৌশল নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক মানুষদের একসঙ্গে দাঁড় করানো।
ইয়ামালদের হাতে ভবিষ্যৎ
একটি বিশ্বকাপ জেতা কঠিন। কিন্তু সেই সাফল্য ধরে রাখা আরও কঠিন। স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তাদের সেরা খেলোয়াড়দের বড় অংশই এখনো ক্যারিয়ারের শুরুতে।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছেন লামিন ইয়ামাল ও পাউ কুবারসি। পেদ্রি, গাভি, নিকো উইলিয়ামস, আলেহান্দ্রো বালদে কিংবা ভিক্টর মুনিয়োজদের বয়সও এমন যে আগামী এক দশক স্পেনের মেরুদণ্ড হয়ে থাকার সামর্থ্য রাখেন। অর্থাৎ এই দলের সেরা সময় হয়তো এখনো আসেইনি।
নারী ফুটবলেও একই গল্প
স্পেনের আধিপত্য শুধু পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৩ সালে নারী বিশ্বকাপ জয়ের পর টানা দুটি নেশনস লিগও জিতেছে তারা। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোতেও প্রায় নিয়মিত চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে স্প্যানিশ মেয়েরা।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে গত এক দশকে নারী ফুটবলে ব্যাপক বিনিয়োগ, আলাদা একাডেমি, উন্নত অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ফলাফল এখন দৃশ্যমান।
সংখ্যাই বলছে সব
শুধু ট্রফি নয়, পারফরম্যান্সেও অন্যদের ছাড়িয়ে গেছে স্পেন। বিশ্বকাপে তারা ছিল সবচেয়ে সংগঠিত দল। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রতিপক্ষকে খুব কম সুযোগ দিয়েছে, বল দখলে আধিপত্য বজায় রেখেছে এবং টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপ জিতেছে। এটি ইউরোপীয় কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ অপরাজিত যাত্রা।
সফল ব্যবস্থার জয়
ফুটবল ইতিহাস বলছে, প্রতিভা অনেক দেশই তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিভাকে দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্যে রূপ দিতে পারে খুব কম দেশ। তারা এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলেছে, যেখানে একজন খেলোয়াড় অবসর নিলে আরেকজন প্রস্তুত থাকে। কোচ বদলালেও দর্শন বদলায় না। একটি প্রজন্ম বিদায় নিলেও নতুন প্রজন্ম একই মান বজায় রাখে।
এই কারণেই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শিরোপা কেবল আরেকটি ট্রফি নয়; এটি স্প্যানিশ ফুটবল মডেলের সফলতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
বিশ্ব ফুটবলে এখন প্রশ্ন একটাই—স্পেনকে কে থামাবে? বর্তমান বাস্তবতা বলছে, উত্তরটি হয়তো এখনো কারও জানা নেই।
৫ বছরে স্পেন দলের সাফল্য
নারী ফুটবলে ১১টি শিরোপা
সিনিয়র দল: ১টি বিশ্বকাপ (২০২৩), ২টি নেশনস লিগ (২০২৪, ২০২৫)।
অনূর্ধ্ব-২০ দল: ১টি বিশ্বকাপ (২০২২)।
অনূর্ধ্ব-১৯ দল: ৫টি অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫, ২০২৬)।
অনূর্ধ্ব-১৭ দল: ১টি বিশ্বকাপ (২০২২), ১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪)।
পুরুষ ফুটবলে ৫টি শিরোপা
সিনিয়র দল: ১টি বিশ্বকাপ (২০২৬), ১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪), ১টি নেশনস লিগ (২০২৩)।
অনূর্ধ্ব-২৩ দল: ১টি অলিম্পিক স্বর্ণপদক (২০২৪)।
অনূর্ধ্ব-১৯ দল: ১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৬)