এ কাজে নিয়োজিত আছেন প্রায় ৪০ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ইতোমধ্যে তাদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১২টার পর মালিবাগ, কাকরাইল, মহাখালী, বনানী, মতঝিল, পল্টন ও রাজাবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে নগর সংস্থার কর্মীদের কাজের ব্যস্ততা দেখা যায়। অলি-গলি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে তারা কাছের সড়কে এনে রাখছেন। সেই স্তূপ থেকে ট্রাকে করে সিটি করপোরেশন বর্জ্য নিয়ে যাচ্ছে ল্যান্ডফিলে।
কোথাও কোথাও ভ্যানে করে বর্জ্য সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) নেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে ট্রাক ও পিকআপে করে সেসব ল্যান্ডফিলে যাওয়া হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটির বর্জ্য যাচ্ছে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে। আর দক্ষিণের বার্জ্য মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে পাঠানো হচ্ছে।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মালিবাগ এলাকার পরিচ্ছন্নতা কর্মী মো. ইকবাল বলেন, "আমরা আগেভাগেই কাজ শুরু কইরা দিছি। আমাদের সিটি করপোরেশন থেইকা যে নির্দেশনা তা ঠিকঠাকমতো মাইন্নাই কাম করতাছি।" ট্রাক ড্রাইভার কবির বলেন, "ময়লা আইব, আমরা লইয়া যামু। সিটি করপোরেশন যে সময় দিছে, তার মধ্যেই আমরা কাজ-কাম সব শেষ করুম।"

ঢাকায় এ বছর প্রায় সাত লাখ পশু কোরবানি হতে পারে, তাতে ৫৫ হাজার টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হবে। এই বিপুল বর্জ্য দ্রুততম সময়ে সরাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এ কাজে নিয়োজিত থাকছেন প্রায় ৪০ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ইতোমধ্যে তাদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে বর্জ্য অপসারণে দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ১৭ লাখের বেশি চটের ব্যাগ, পলিব্যাগ ও বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। কোরবানির পর দ্রুত জীবাণুমুক্ত ও দুর্গন্ধমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরবরাহ করা হয়েছে ব্লিচিং পাউডার ও স্যাভলন।
কোরবানির বর্জ্য অপসারণসংক্রান্ত নাগরিক অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দুটি হটলাইন নম্বর চালু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। নম্বর দুটি হলো— ০১৭০৯৯০০৮৮৮ এবং ০২২২৩৩৮৬০১৪।
রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত হয় বৃহস্পাতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। পাড়া-মহল্লার বেশিরভাগ মসজিদে ঈদের নামজ হয় সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে।
আবহাওয়া অফিস বলেছিল, এবার ঈদের দিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের পাঁচ বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে চার বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে।
সকালে শুরুর দিকে ঢাকার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও ঈদের নামাজের সময় বৃষ্টির বিড়ম্বনা পোহাতে হয়নি। বরং সকাল ৯টার পর রোদের দেখা মিলেছে। ঈদ জামাত শেষে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন পশু কোরবানির তোড়জোড়ে।
বৃষ্টি না থাকায় পশু জবাই ও মাংস ব্যবস্থাপনার কাজ বেশ সহজ হয়েছে নগরবাসীর জন্য। তবে আগের দিনের জমে থাকা বৃষ্টির পানির কারণে কোথাও কোথাও কিছুটা বিড়ম্বনা তৈরি করেছে।
সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থান থাকলেও প্রতিবারের মত এবারও রাজধানীর অলিগলি আর রাস্তার ওপর পশু কোরবানি দিচ্ছেন বেশিরভাগ মানুষ।
সকালে মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, মগবাজার, শান্তিবাগ, মৌচাকসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাসার সামনে, গলির ভেতরে বা খোলা জায়গায় চলছে পশু জবাই ও মাংস কাটাকাটির কাজ। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যস্ততা আরও বাড়ে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নাগরিকদের নির্দিষ্ট স্থানে আনার চেষ্টা হিসেবে ৭৫টি ওয়ার্ডে ৩৫৭টি সুনির্দিষ্ট কোরবানির স্থান নির্ধারণ করে অস্থায়ী শেড ও পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তবে বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের বাসার নিচে বা রাস্তায় কোরবানি দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কর্মী দিয়ে তিনদিনে প্রায় ৩৪ হাজার টন বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নেওয়ার কথা বলেছেন প্রশাসক আবদুস সালাম।

প্রথম দিনে প্রায় ১৫ হাজার ৯৩৫ টন, দ্বিতীয় দিনে প্রায় ১১ হাজার ৭৭৬ টন এবং তৃতীয় দিনে প্রায় ৬ হাজার ২৩১ টন বর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা রয়েছে উত্তর সিটির কর্মীদের।
দুপুর দেড়টায় কলাবাগানে বর্জ্যের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থেকে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে কোরবানির বর্জ্য পরিবহন শুরু হবে। পরের ৮ ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে ঈদের প্রথম দিনের বর্জ্য অপসারণ করা হবে।
নগরবাসীকে কোরবানির পশুবর্জ্য নালা-নর্দমায় না ফেলার অনুরোধ জানিয়ে প্রশাসক বলেছেন, “কোনোভাবেই কোরবানির বর্জ্য কোনো ড্রেনের মধ্যে ফেলবেন না। দেখেন বৃষ্টি যে কোনো সময় হতে পারে, কোরবানির আবর্জনা যদি আপনি ড্রেনের মধ্যে ফেলেন, তাহলে পানি আটকে যাবে, পানি রাস্তায় চলে আসবে। তখন আপনারাই বলবেন যে সিটি করপোরেশন পরিষ্কার করে নাই।”
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০ হাজার ৮৮৯ টন বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দিয়েছে।
বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সফল করতে সাড়ে ৭০০ গাড়ি আর ১৬ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত করার কথা বলেছেন উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, "সরকারের ঘোষিত ১২ ঘণ্টার আগেই কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করে নগরবাসীকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ উপহার দিতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আমরা ইনশাআল্লাহ সরকারের নির্ধারিত সময়ের আগেই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার কোরবানির বর্জ্য অপসারণ সম্পন্ন করতে সক্ষম হব।"
বর্জ্য ডাম্পিং নির্বিঘ্ন করতে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নতুন সংযোগ সড়ক, প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেঞ্চ নির্মাণ করেছে ডিএনসিসি। এছাড়া ডিজিটাল ওয়েব্রিজের মাধ্যমে বর্জ্যবাহী গাড়ির কার্যক্রম সার্বক্ষণিক রিয়েল-টাইম তদারকি করা হবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএনসিসি বলেছে, বর্জ্য সরানোর কাজ সহজ করতে ১৬ লাখ ৩০ হাজার পলিব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। কোরবানির পর দ্রুত জীবাণুমুক্ত ও দুর্গন্ধমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ৩ হাজার ৬০০ বস্তা ব্লিচিং পাউডার, ১ হাজার ৩৪৮ ক্যান ফিনাইল এবং ৩ হাজার ৯০০ ক্যান স্যাভলন বিতরণ করা হয়েছে।
শান্তিবাগের বাসিন্দা বিপাশা রফিক বলেন, "রক্ত-গোবর, উচ্ছিষ্ট আমাদের কাজ মোটামুটি শেষ করার পরেই নিয়ে যাচ্ছে দেখলাম। ঠিকমত পরিষ্কার না করলে সন্ধ্যার পর থেকে রাস্তায় গন্ধে হাঁটা যাবে না।"
আরেক বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, "সিটি করপোরেশন কাজ তো করে যাচ্ছেই। আমরাও আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে যতই চেষ্টা করা হোক, কিছুটা গন্ধ আগামী কয়েকদিন থাকবেই।"