ক্যাঙ্গারুর দেশে বাঘের গর্জন, ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস

ক্রীড়া প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
বাংলাদেশের জয় উদযাপন। ছবি: বিসিবি ছবি:
বাংলাদেশের জয় উদযাপন। ছবি: বিসিবি ছবি:

দুই দলের শক্তির পার্থক্য ছিল কাগজে-কলমে আকাশ-পাতাল। সর্বশেষ দুটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলা অস্ট্রেলিয়া গত ২৩ টেস্টের ১৮টিতেই জিতেছিল। বিপরীতে, বিদেশের মাটিতে ধারাবাহিকভাবে সংগ্রাম করা বাংলাদেশের এশিয়ার বাইরে সর্বশেষ ২৬ টেস্টে হার ছিল ২২টি। কিন্তু ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে পরিসংখ্যানকে একেবারেই পাত্তা দিল না বাংলাদেশ। চার দিনেরও কম সময়ে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দল শুধু একটি টেস্ট জেতেনি, নিজেদের টেস্ট ক্রিকেটের সক্ষমতা নিয়ে নতুন বার্তা দিয়েছে ক্রিকেট বিশ্বকে।

ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষায় ছিল আত্মবিশ্বাস। অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট করার পর ব্যাট হাতে ৪২৬ রান করে ২২৮ রানের বিশাল লিড নেয় বাংলাদেশ। সেই লিডের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। লোয়ার অর্ডারকে সঙ্গে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ৬৫ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। তার ব্যাটিং শুধু বাংলাদেশের স্কোর বড় করেনি, অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর মানসিক চাপও তৈরি করেছিল। এরপর বল হাতেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মিরাজ। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন এই অলরাউন্ডার।

মুরালি-অশ্বিন-হারভাজান-জাদেজারা পারেননি, মিরাজ পেরেছেন

বাংলাদেশের জয়ের আরেক নায়ক হাসান মাহমুদ। পুরো ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে বারবার বিপদে ফেলেছেন তিনি। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে রাখেন হাসান। তার বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা বড় জুটি গড়ার সুযোগই পাননি।

একসময় অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একমাত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন ক্যামেরন গ্রিন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ব্যাট করে ঘরের মাঠে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। চারটি বাউন্ডারিতে সাজানো ১০০ রানের ধৈর্যশীল ইনিংসটি অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফেরানোর শেষ চেষ্টা ছিল। কিন্তু হাসান মাহমুদের বলে ব্যাটের কানায় লেগে বল স্টাম্পে আঘাত করতেই গ্রিনের প্রতিরোধের অবসান ঘটে। কার্যত সেখানেই শেষ হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার শেষ আশাটুকুও।

ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে তৃতীয় দিন শেষে ৪ উইকেটে ১৬১ রান করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ৬ উইকেট হাতে নিয়ে তখনও ৬৭ রানে পিছিয়ে ছিল অসিরা। ক্যামেরন গ্রিন ৪৩ ও অ্যালেক্স ক্যারি ১৯ রানে অপরাজিত ছিলেন। 

চতুর্থ দিন ক্যারিকে ৩০, বো ওয়েবস্টারকে ৫, অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে ৮ রানে বিদায় করেন বাংলাদেশ স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ। মিচেল স্টার্ককে ১৮ রানে তাসকিন আহমেদ এবং সেঞ্চুরিয়ান ক্যামেরন গ্রিনকে ১০৪ রানে থামান হাসান মাহমুদ। অস্ট্রেলিয়ার শেষ ব্যাটার নাথান লায়নকে ১৫ রানে লেগ বিফোর আউট করেন মিরাজ। ফলে ২৮৪ রানে গুটিয়ে যায় অসিরা। এতে জয়ের জন্য বাংলাদেশকে ৫৭ রানের টার্গেট দিতে পারে অস্ট্রেলিয়া। বল হাতে বাংলাদেশের মিরাজ ৬৬ রানে ৫টি, হাসান মাহমুদ ৩টি ও তাইজুল ইসলাম-তাসকিন ১টি করে উইকেট নেন। 

অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রানে গুটিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। এমন লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে কোনো অঘটনের সুযোগ রাখেনি বাংলাদেশ। চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় সেশনেই অনায়াসে জয় নিশ্চিত করে শান্তর দল। মুমিনুল হক অপরাজিত থাকেন ৩০ রানে এবং সাদমান ইসলাম অপরাজিত থাকেন ২৫ রানে। মুমিনুলের ব্যাট থেকে আসা বাউন্ডারিতেই নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়। বাউন্ডারির পর মুমিনুলের উদযাপন ছিল বরাবরের মতোই শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত উদযাপনের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক অসাধারণ মুহূর্ত।

ক্যাঙ্গারুর দেশে বাঘের গর্জন

শুধু জয় নয়, মানসিকতার পরিবর্তন

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয় বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো স্বপ্ন নয়—কিন্তু বাস্তবায়ন করা ছিল কঠিনতম চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের দুর্বলতার যে দীর্ঘদিনের পরিচিতি, ডারউইনে সেটিই যেন এক ধাক্কায় প্রশ্নের মুখে পড়ল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই জয় কোনো একক খেলোয়াড়ের অসাধারণ পারফরম্যান্সের ফল নয়।

ব্যাটিংয়ে মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান, বোলিংয়ে মিরাজ-হাসানের নেতৃত্ব এবং শেষ পর্যন্ত মুমিনুল-সাদমানের দায়িত্বশীল ব্যাটিং—সব মিলিয়েই এসেছে জয়টি।

২০১৭-এর চেয়েও বড়?

২০১৭ সালে ঢাকায় অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেটি ছিল দেশের মাটিতে বড় এক অর্জন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার নিজেদের মাঠে তাদের হারানোর চ্যালেঞ্জ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই কারণেই ডারউইনের জয়কে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও এটিকে শুধু টেস্ট নয়, সব সংস্করণ মিলিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা জয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই জয় তাই কেবল স্কোরকার্ডের একটি ফল নয়। এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের জায়গায় একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতও হতে পারে।

তবে সিরিজ এখানেই শেষ নয়। বরং ডারউইনের জয় বাংলাদেশের সামনে নতুন একটি চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে—এই পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। দুই ম্যাচের সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে ২২ আগস্ট, ম্যাকের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায়। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় শুরু হবে ম্যাচটি।

ডারউইনে বাংলাদেশ যে বার্তা দিয়েছে, এখন সেটিকে সিরিজ জয়ে রূপ দেওয়ার পালা। কারণ একটি ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশকে আলোচনায় এনেছে; কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি সিরিজ জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসকেই নতুন করে লিখে দিতে পারে।

দুই দলের শক্তির পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। সর্বশেষ দুটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলা অস্ট্রেলিয়া গত ২৩ টেস্টের ১৮টিতেই জয় পেয়েছিল। অন্যদিকে বিদেশের মাটিতে ধারাবাহিকভাবে সংগ্রাম করা বাংলাদেশ এশিয়ার বাইরে সর্বশেষ ২৬ টেস্টের ২২টিতেই হেরেছিল। তবে মাঠের ক্রিকেটে এসব পরিসংখ্যানের কোনো প্রভাবই দেখা যায়নি। টেস্ট ইতিহাসে অসিদের বিপক্ষে এটি দ্বিতীয় জয় বাংলাদেশের। ২০১৭ সালে ঘরের মাঠ মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম হারিয়েছিল টাইগাররা। 
 

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

 

অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ১৯৮

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪২৬ 

অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: ২৮৪

বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: (লক্ষ‍্য ৫৭) ১৪.২ ওভারে ৫৭/১

ফল : বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী। ম্যাচসেরা : হাসান মাহমুদ (বাংলাদেশ)

এলাকার খবর

সম্পর্কিত