তিস্তার পানি আসবে, নাকি শুধুই প্রতিশ্রুতি?

প্রশান্ত কুমার শীল
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
তিস্তা মানেই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকের ধানের ক্ষেত, জেলের জাল, নৌকার বৈঠা আর চরবাসীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। ছবি: ফরহাদ আলম সুমন ছবি:
তিস্তা মানেই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকের ধানের ক্ষেত, জেলের জাল, নৌকার বৈঠা আর চরবাসীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। ছবি: ফরহাদ আলম সুমন ছবি:

পশ্চিমবঙ্গে এখন আর মমতার সরকার নেই, তাহলে কি এবার কাটবে তিস্তার জট? নাকি আবারও কূটনীতির বেড়াজালে আটকে যাবে উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘশ্বাস? চীনের ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বনাম ভারতের নিরাপত্তা সমীকরণ—কোন পথে হাঁটবে বাংলাদেশ?

‘নদী, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?’—উৎস সন্ধানের এই চিরন্তন জিজ্ঞাসা যেন তিস্তার ক্ষেত্রে নির্মম পরিহাসের মতো শোনায়। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে এখন তিস্তার প্রশ্নটি আর উৎসের নয়, বরং প্রবাহের। তিস্তা হলো এই অঞ্চলের মূল ভরকেন্দ্র। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ জনপদ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। এখানে তিস্তা মানেই কৃষকের ধানের ক্ষেত, জেলের জাল, নৌকার বৈঠা আর চরবাসীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময় এই নদীর বুকে এখন পানির বদলে শুধুই ধু-ধু বালুচর। বর্ষায় তিস্তা যেমন ভয়ঙ্কর, শুষ্ক মৌসুমে তেমনি হয়ে পড়ে এক মৃত নদী।

দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা চলছে। কিন্তু চুক্তিটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে। এতদিন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সবচেয়ে বড় অজুহাত ছিল—পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে তারা চুক্তি করতে পারছে না। কিন্তু সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি রাজ্য সরকার গঠনের পর ওই যুক্তির আর কোনো ভিত্তি নেই। দিল্লি ও কলকাতা—দুই জায়গাতেই এখন একই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায়।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে এখন একটি বড় নৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা দিতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি একমাত্র বাধা হয়ে থাকতেন, তবে এখন চুক্তি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ কোথায়? নতুন উদ্যোগ কোথায়?

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তিস্তা চুক্তির বল এখন সরাসরি দিল্লির কোর্টে। বাংলাদেশের মানুষ এবার কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায়। যদি এবারও চুক্তি না হয়, তবে স্পষ্ট হবে যে বিজেপি সরকার মমতাকে ঢাল বানিয়ে সময় ক্ষেপণ করার কৌশল নিয়েছিল।

তিস্তা নিয়ে ভারতের আপত্তিকে কেবল রাজনৈতিক চাল বলাটা সরলীকরণ হবে। শুষ্ক মৌসুমে ভারতের উত্তরবঙ্গের ছয়টি জেলা—জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ—পানির সংকটে থাকে। দিল্লি তাদের নিজেদের কৃষকদের স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না, এটাই স্বাভাবিক। আবার বিগত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের দাবি ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে শুধু তিস্তা নয়, তোর্ষা, জলঢাকা, রাইডাকসহ অন্যান্য নদী নিয়েও একসঙ্গে আলোচনা হওয়া উচিত। যদি এমনটা করা হয় তাহলে তিস্তা-কেন্দ্রিক চুক্তি আরও জটিল হয়ে পড়বে। এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তন ও উজানের বাঁধ পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ৫৪টি অভিন্ন নদীর যৌথ ব্যবস্থাপনা এবং পানির ন্যায্য হিস্যা বণ্টন নিশ্চিত করা। কিন্তু পাঁচ দশক পার হলেও বাস্তবতা খুব বেশি বদলায়নি। ১৯৮৩ সালে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল, কিন্তু সেটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে রূপ নেয়নি। ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর নরেন্দ্র মোদীর সরকারও বারবার ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। অথচ এই সময়ে গঙ্গা ও কুশিয়ারা নিয়ে চুক্তি হয়েছে। স্থলসীমান্ত চুক্তিও বাস্তবায়িত হয়েছে। শুধু তিস্তাই যেন অপেক্ষার নদী হয়ে রয়ে গেছে।

তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার প্রশ্নটি কেবল কূটনীতির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এখানে মানবিকতার প্রশ্নও জড়িত। শুষ্ক মৌসুমে ডালিয়া ব্যারেজ এলাকায় পানির প্রবাহ এতটাই কমে যায় যে হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদী থাকে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিস্তা শুধু নদী নয়, রাষ্ট্রীয় অধিকার এবং জাতীয় মর্যাদার লড়াইও। পদ্মা যেমন আমাদের আত্মমর্যাদার গল্প, তিস্তা তেমনি অপূর্ণ ন্যায়বিচারের গল্প।

সাম্প্রতি চীন সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছেন। চীনের সঙ্গে চুক্তি, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতা তিস্তা প্রশ্নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বটে। বাংলাদেশ এখন শুধু অপেক্ষা করছে না, বিকল্প উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গেও কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। অর্থাৎ তিস্তা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ বিকল্প পথ খুঁজছে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, তিস্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান তৃতীয় কোনো দেশ দিতে পারবে না। কারণ পানির উৎস এবং নিয়ন্ত্রণ ভারতের উজানেই।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য বড় বিষয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়নার (পাওয়ার চায়না) মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপর চীন তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব করে। এই মহাপরিকল্পনায় রয়েছে ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, ১৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, মৎস্য উন্নয়ন, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর, আধুনিক কৃষি অঞ্চল, নৌ যোগাযোগের উন্নয়ন, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ।

চীন কেবল নদী খননের মধ্যে এই মহাপরিকল্পনা সীমাবদ্ধ করবে না। তারা তিস্তাকে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান শহরের আদলে সাজাতে চায়। স্বাভাবিকভাবেই, এই মহাপরিকল্পনা নিয়ে ভারতের তীব্র আপত্তি রয়েছে এবং তারা একে নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছে—যদিও বাস্তবে এর কোনো শক্ত ভিত্তি নেই।

তিস্তা নিয়ে আরেকটা মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়। তা হলো নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে কেবল অবকাঠামো দিয়ে কত দূর এগোনো সম্ভব? নদীশাসন প্রয়োজন, কিন্তু পানির ন্যায্য হিস্যা তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন। তিস্তায় প্রাণ ফিরে আসবে তখনই, যখন উজান ও ভাটির মধ্যে ন্যায্য ও টেকসই পানি বণ্টন নিশ্চিত হবে। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশ বহুবার আশাবাদী হয়েছে। বহুবার প্রতিশ্রুতি শুনেছে। কিন্তু তিস্তার বুকে পানি আসেনি। আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। যদি নরেন্দ্র মোদীর সরকার সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চায়, তবে তিস্তা চুক্তিই হতে পারে সবচেয়ে বড় আস্থার প্রতীক। কারণ কূটনীতির ইতিহাসে কিছু চুক্তি কেবল কাগজে লেখা থাকে না, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন কঠিন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। একদিকে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা, অন্যদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো। কোনো দেশের পক্ষ না নিয়ে একমাত্র জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে। তিস্তা নিয়ে কোনো দেশের পক্ষ বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে তিস্তা চুক্তিকে শুধু একটি পানিবণ্টন চুক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সঙ্গেও জড়িত। তবে বাস্তবতা হলো, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তাহলে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা অসম্ভব নয়।

প্রশান্ত কুমার শীল শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল vprashantcu@gmail.com

এলাকার খবর

সম্পর্কিত