মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের পর্যবেক্ষণ বলছে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অধিকাংশই হচ্ছে মাদ্রাসায়৷
বাংলাদেশে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে ধর্ষণের মোট হিসাব রাখলেও আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসাব রাখে না৷ ফলে মাদ্রাসায় কত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে তার বছর বা মাসভিত্তিক আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই৷ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সহ-সভাপতি বলছেন, মাদ্রাসাগুলোতে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে, তবে যেভাবে প্রচার করা হয় ততটা নয়৷
মানবাধিকার সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সম্প্রতি এক বিবৃতিতে মাদ্রাসাগুলোতে ক্রমবর্ধমান যৌন নিপীড়নে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা বন্ধে সেখানে যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি করার দাবি জানিয়েছে৷
আর হেফাজতে ইসলাম এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, সংবাদমাধ্যমে আসা যৌন নির্যাতনের কিছু অভিযোগকে ঘিরে কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ‘কাঠামোগত অপপ্রচার’ হচ্ছে৷ বিবৃতিতে সংগঠনটির অভিযোগ, ‘‘এসব ঘটনা নিয়ে কওমি মাদ্রাসার ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীলদের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে৷’’
কয়েকটি ঘটনা
ঘটনা ১: কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে ২১ জুলাই এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে মোস্তাফিজুর রহমান নামে ওই মাদ্রাসার এক শিক্ষককে আটক করে পুলিশ৷ ১২ জুলাই ওই শিক্ষার্থীকে বলাৎকার করার পর তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযোগ করা থেকে বিরত রেখেছিলেন ওই শিক্ষক৷ কিন্তু অন্য শিক্ষার্থীরা ঘটনাটি দেখে ফেলায় জানাজানি হয়ে যায়৷ পরে পুলিশ ওই শিক্ষককে আটক করে৷ তাকে আটকের পর ভিকটিম শিক্ষার্থী পুলিশকে দেয়া জবানবন্দিতে বলে, ‘‘১২ তারিখ সকালে ঘুমিয়ে ছিলাম৷ সেসময় হুজুর এসে আমার সঙ্গে জিনা (বলাৎকার) করেছে৷ তখন আমি চোখ খুললে হুজুর মাথায় হাত দিয়ে বলে মনে করো তুমি স্বপ্ন দেখতেস৷’’ ওই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, স্বপ্ন দেখার কথা বলে হুজুর মোস্তাফিজুর রহমান ১০ থেকে ১২ দিন তাকে বলাৎকার করেছে৷
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাটি সালিশের মাধ্যমে আপসের চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু শিক্ষার্থীর বাবা তা হতে দেননি৷ তিনি পুলিশকে জানান৷ তিনি বলেন, ‘‘হুজুর একাধিকবার ছেলেকে বলাৎকার করেছে৷ সেই খবর শুনে মাদ্রাসায় এসে দেখি সালিশ চলছে৷ আমি এর সঠিক বিচার চেয়ে পুলিশকে জানাই৷’’
ঘটনা ২: ৪ আগস্ট চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে মাদ্রাসার আট বছর বয়সি শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব৷ গ্রেফতার রমিজ উদ্দীন বাঁশখালীর একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষক৷ মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ভুক্তভোগী শিশুটি ওই মাদ্রাসার নাজেরা বিভাগের শিক্ষার্থী৷ মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে প্রধান শিক্ষক শিশুটিকে ওয়াশরুমে নিয়ে বলাৎকার করতেন৷
ঘটনা ৩: গত ৭ মে নেত্রকোনায় মাদ্রাসা শিক্ষক আমানুল্লা মাহমুদীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷ গ্রেপ্তারের পর তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়৷ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার ধর্ষণে ১১ বছর বয়সের একা মাদ্রাসা শিক্ষার্থী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে৷ পুলিশ জানিয়েছে, একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছে সে৷ কিন্তু মামলা হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি৷
ঘটনা ৪: ২০২৫ সালের ৮ মার্চ গাজীপুরের শ্রীপুরে মাদ্রাসায় শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আবদুল মালেক নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ ঘটনার পর ওই শিশুর পরিবারের সদস্য ও এলাকার লোকজন আবদুল মালেককে আটক করেন৷ তিনি ধর্ষণচেষ্টার কথা স্বীকার করেন এবং পরে তাকে পুলিশে দেয়া হয়৷ আতিকুর রহমান নামে একজনের ফেসবুক আইডি থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করে আবদুল মালেক ধর্ষণচেষ্টার কথা স্বীকার করেন৷ ৫৪ সেকেন্ডের ভিডিও তিনি বলেন, ‘‘আমি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে করে ফেলেছি৷ এমন কাজ আমি আর কখনো করিনি৷ তাকে খারাপ কাজ করিনি৷’’
ঘটনা ৫: ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের একটি মাদ্রাসার শিক্ষককে আটকের পর তাকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে র্যাব৷ ধর্ষণের শিকার তিন শিক্ষার্থীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়৷ সংবাদ সম্মেলনে র্যাব জানায় ওই মাদ্রাসা শিক্ষক তিন বছরে মোট ১১ জন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন হয়রানি করে আসছিল৷ তিনি কখনো আখিরাতের ভয়, হুজুরের কথা শোনা ফরজ, না শুনলে গোনাহ হবে, জাহান্নামে যেতে হবে ইত্যাদি ভয় দেখাতেন৷ আবার কখনও তাবিজ করে পাগল করা, পরিবারের ক্ষতি করার ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি বিভিন্ন বয়সি মাদ্রাসার ছাত্রীদের ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি করতেন৷ অনেককেই তিনি এই ভয় দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি করেছেন৷ তাদের মধ্যে আট বছর বয়সের একটি শিশুও আছে৷
ঘটনা ৬: ওই একই বছরের ৬ জুলাই নেত্রকোনার কেন্দুয়ার একটি মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবুল খায়ের বেলালি গণপিটুনির শিকার হন৷ পরে তাকে পুলিশে তুলে দেয়া হয়৷ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি আট থেকে ১১ বছরের কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্রীকে বিভিন্ন সময় ধর্ষণের পর তা প্রকাশ না করতে পবিত্র কোরান ছুঁইয়ে শপথ করান৷ কিন্তু তাদের মধ্যে একজন ছাত্রী ধর্ষণের শিকার ও কোরান শপথের পর তার পরিবারের কাছে তা প্রকাশ করলে আরো ঘটনা বেরিয়ে আসে৷ তখন বিক্ষুব্ধ অভিভাবকরা গিয়ে তাকে গণপিটুনি দেয়৷

ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে ধর্ষণের মোট হিসাব রাখলেও আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসাব রাখে না৷ ফলে মাদ্রাসায় কত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে তার বছর বা মাসভিত্তিক আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই৷
বাংলাদেশে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ৪০৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে৷ এর মধ্যে ২৩৮ শিশু ও কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ এছাড়া, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে৷
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য দেয়া হয়৷ আর জুলাই মাসে ৯৫ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ এর মধ্যে ৬১ জন ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু ও কিশোরী৷ ১১ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷
আর মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে গত ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ৩১৯টি ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে৷ তাদের মধ্যে ১৬৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু৷ ধর্ষণের পর ছয় মাসে হত্যা করা হয়েছে ৩০ জনকে৷
আসক বলছে ২০২৫ সালে ৭৫৯টি ধর্ষণ এবং সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে৷ তাদের মধ্যে ৩৭০ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু৷ ওই সময়ে ৩৬ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে৷
‘শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অধিকাংশই হচ্ছে মাদ্রাসায়’
মাদ্রাসার ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১. প্রধানত: শিক্ষকদের ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা ২. মেয়ে শিক্ষার্থীদের মতোই ছেলে শিক্ষার্থীরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন ৩. অনেক সময়ই ভয় দেখিয়ে বা ধর্মের কথা বলে যৌন হয়রানির ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয় ৪. কেউ কেউ দীর্ঘ সময় ধরে ধর্ষণের শিকার হন ৫. ধর্ষণের শিকার যারা হন তারা প্রায় সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশু৷
আসকের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আলাদা হিসাব রাখি না৷ ফলে মাদ্রাসার আলাদা কোনো হিসাব নেই৷ তবে আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অধিকাংশই হচ্ছে মাদ্রাসায়৷ অন্য মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে হয় না, তা নয়৷ কিন্তু মাদ্রাসায় বেশি হয়৷ আর মাদ্রাসায় ছেলে শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ বা বলাৎকার উদ্বেগজনকহারে দেখতে পাচ্ছি৷’’
আর হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রধান নির্বাহী ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘মাদ্রাসায় এটা নতুন নয়, আগেও ছিল৷ এখন হয়তো ঘটনা বেশি প্রকাশ পাচ্ছে তাই আমরা জানতে পারছি৷ তবে এটা সংবাদমাধ্যমে যতটা আসে তার চেয়ে বাস্তবে আরো বেশি ঘটে বলে ধারণা করছি৷ কারণ অনেক ঘটনাই গোপন থাকে৷’’
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘‘আসলে মাদ্রাসাগুলোতে কোনো মনিটরিং নেই, তাই এই অবস্থা৷ মাদ্রাসাগুলোর বড় একটি অংশ আবাসিক৷ অভিভাবকরাও তেমন খোঁজ খবর রাখেন না৷ আর সেখানে ধর্মের নামে ভয়ও দেখানো হয়৷ ভয় দেখিয়ে যৌন হয়রানি করা হয়৷ আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি পবিত্র কোরান হাতে দিয়েও ঘটনা গোপন রাখার শপথ করানো হয়েছে৷’’
মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ যা বলছেন
কওমি ধারার মাদ্রাসা ঢাকার লালবাগের জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগ মাদ্রাসার প্রধান মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি বলেন, ‘‘যেখানে এই ধরনের অপরাধ হচ্ছে সেখানেই আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলছি৷ আমরা মনিটরিং করছি৷ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক) থেকেও নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে৷ তারাও এটা নিয়ে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে৷ কিন্তু আমরা অনুসন্ধানে দেখছি একটি মহল মাদ্রাসা শিক্ষাকে টার্গেট করছে, তারা তিলকে তাল বানাচ্ছে৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা ঘটেনি তাই প্রচার করা হচ্ছে৷’’ তিনি বলেন, ‘‘মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে দেয়া যাবে না৷ সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক আছি৷ এরজন্য যা যা করা দরকার তা আমরা মাদ্রাসাগুলোতে করছি৷’’

ঢাকার খিলগাঁও-এর দারুন কুরআন মেহেরুন্নেসা মহিলা মাদ্রাসার পরিচালক মুফতি মেহেদি হাসান বলেন, ‘‘মাদ্রাসায় ধর্ষণ, যৌন হয়রানির যেসব তথ্য সংবাদমাধ্যমে আসে তার অধিকাংশই অপপ্রচার৷ মাদ্রাসাগুলোতে এই ধরনের ঘটনা ঘটে না বললেই চলে৷ আর যদি হয় তা মোট ঘটনার এক শতাংশেরও অনেক কম৷ পয়েন্ট জিরো জিরো সামথিং৷ আসলে যেটা হয়, তা হলো সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবাররা কিছু অর্থ আয় করার জন্য এই অপপ্রচারগুলো চালায়৷’’
তার দাবি, ‘‘যা হয় তা শয়তানের কু-পরামর্শে৷ মানুষকে শয়তান যখন কু-পরামর্শ দেয় তখন মানুষ ভুল করে৷ সেই ভুল যদি মানুষ বুঝতে পারে, ক্ষমা চায়৷ ক্ষমা তো পেতে পারে৷ কিন্তু বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাকে কলঙ্কিত করা জন্য অপপ্রচার করা হচ্ছে৷ এটা শয়তানের কাজ৷’’ তিনি তার নিজের মাদ্রাসা সম্পর্কে বলেন, ‘‘আমাদের এখানে অভিভাকরা আসেন, তারা কোনো অভিযোগ থাকলে তা করতে পারেন৷ আবার আমাদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে৷ ছাত্রীরাও অভিযোগ করতে পারেন৷ আর মাদ্রাসার প্রবেশ পথসহ ক্লাসের বাইরে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে৷ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড অনুমোদন না করায় আমরা ক্লাসের ভিতরে সিসি ক্যামেরা লাগাই নাই৷ আর আমাদের শিক্ষকদের অধিকাংশই মহিলা৷ উপরের ক্লাসে পড়ানোর জন্য কিছু পুরুষ শিক্ষক আছেন৷’’
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (আলিয়া মাদ্রাসা) চেয়ারম্যান প্রফেসর খন্দকার মো. সাদেকুর রহমান বলেন, ‘‘কওমি মাদ্রাসাগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই৷ তারা আলাদা৷ আমি আলিয়া মাদ্রাসার ব্যাপারে বলতে পারবো৷ আমরা যৌন হয়রানির অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিই৷ অভিযোগ প্রমাণ হলে শিক্ষককে বরখাস্ত করি৷ কিন্তু ফৌজদারি মামলা হলে সেটা তো আদালত দেখে৷’’ তিনি জানান, ‘‘আমরা কিছু অভিযোগ পাই, তবে তা সংখ্যায় খুব বেশি নয়৷ আমাদের এগুলো দেখার জন্য আলাদা কমিটি আছে৷ আর মাদ্রাসাগুলোতেও মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলছি৷ এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা সতর্ক আছি৷’’
আর কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) সহ-সভাপতি ও সিলেটের গওহরপুর কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মুসলেহউদ্দিন রাজু বলেন, ‘‘মাদ্রাসাগুলোতে যৌন হয়রানির ঘটনা যে ঘটে না, তা নয়৷ তবে যেভাবে প্রচার করা হয় তত নয়৷ কখনো কখনো অন্য ঘটনার ভিডিও জুড়ে দিয়েও অপপ্রচার করা হয়৷ আর সব কওমি মাদ্রাসা আমাদের বোর্ডের অধীনে রেজিষ্টার্ড নয়৷ আমাদের বোর্ডের অধীনে যারা আছে সেখানে যৌন হয়রানি রোধে আমরা নীতিমালা করে দিয়েছি৷ বিশেষ করে মহিলা ও আবাসিক মাদ্রাসার ব্যাপারে আমাদের বিশেষ নজনদারি আছে৷ মাদ্রাসাগুলোতে সিসি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে৷ ভবন, বসার ব্যবস্থা, শিক্ষকদের আচরণ এইসব ব্যাপারে আমাদের নিজস্ব নীতিমালা আছে৷ আর অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিই৷ যেখানে ফৌজদারি মামলা দরকার সেখানে তার সুপারিশ করি,’’ বলেন তিনি৷
মাওলানা রাজু জানান, ‘‘দেশে ৩৫ হাজারের মতো নিবন্ধিত কওমি মাদ্রাসা আছে৷ এর বাইরে আরো ১৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা আছে, যাদের নিবন্ধন নেই৷ ফলে তাদের আমরা মনিটরিং-এর আওতায় আনতে পারছি না৷ বিশেষ করে মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমাদের নীতিমালা আছে৷ সেটা সবার মানা উচিত৷’’
‘‘যৌন হয়রানির ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি৷ তারপরও মানুষ তো ভুল করে৷ আর এটা তো মাদ্রাসার বাইরেও হয়৷ তাই আমাদের সবাই মিলে এর বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে,’’ বলেন বেফাক এর সহ-সভাপতি মাওলানা রাজু৷
গবেষক ও বিশ্লেষকরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘আসলে যে মাদ্রাসাগুলোতে এই ধরনের ঘটনা ঘটে তার বড় একটি অংশ আবাসিক৷ সেখানে পড়াশোনা, থাকা, খাওয়া সব কিছুই ফ্রি৷ আর যারা সেখানে পড়েন তাদের বড় একটি অংশই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা৷ ফলে মনিটরিং থাকে না৷ জবাবদিহিতার অভাব আছে৷ অভিভাবকরাও খোঁজ রাখেন না৷ তবে এটা যে শুধু মাদ্রাসায় ঘটে তা নয়৷ অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ঘটে৷ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সে সমস্যা আছে, সেখান থেকেই এর উদ্ভব৷ সমস্যাটা গভীরে গিয়ে দেখতে হবে৷ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি রোধে সেল গঠন করতে হবে৷ সেই সেল সব বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই৷ তাহলে আপনি মাদ্রাসায় আশা করেন কীভাবে?’’ বলেন তিনি৷

সাংবাদিক সাইফুল বাতেন টিটো মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন নিয়ে ২০১৯ সালে একটি বই লেখেন, নাম ‘বিষফোঁড়া’৷ তিনি জানান, তিনি শুধু ছেলেদের মাদ্রাসা নিয়ে কাজ করেছেন এবং সেজন্য ২০০ মাদ্রাসায় গিয়েছেন৷ আর এই কাজ করতে গিয়ে তিনি দাঁড়ি, টুপি পরে ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন৷ তার কথা, ‘‘সেই সময়ে আমি দেখেছি মাদ্রাসাগুলোতে শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয় এবং তা আগে থেকেই চলে আসছিল৷ মূলত বিচারহীনতাই ছিল এর প্রধান কারণ৷ কেউ অভিযোগ করলে এর বিচার পায় না৷ আবার মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও ধামাচাপা দেয়৷ অনেকেই ভয়ে প্রকাশ করে না৷ আমি মূলত কওমি মাদ্রাসা নিয়ে কাজ করেছি৷ এর অধিকাংশই আবাসিক৷ যারা পড়তে আসে তাদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের৷ তাদের পরিবারও খোঁজ খবর নেয় না৷’’ টিটো বলেন, ‘‘আসলে যেটা হয়েছে তা হলো সেখানে এক ধরনের শিশুকাম প্রবৃত্তি গড়ে উঠেছে৷ আবার এই ছাত্ররাই বড় হয়ে কেউ কেউ শিক্ষক হয়৷ তাদের মধ্যেও একই ধরনের প্রবণতা তৈরি হয়৷ আমার বিবেচনায় এটা একটা দুষ্টচক্রের মতো৷’’
বাংলাদেশে ওই বইটি ২০২০ সালে সরকার নিষিদ্ধ করে৷ আর লেখকও নানা হুমকির মুখে পড়েন৷ সাইফুল বাতেন বলেন, ‘‘বইটি প্রকাশের পর আমাকে নানা দিক থেকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়৷ শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমি দেশের বাইরে চলে আসি৷’’ তিনি এখন ইউরোপের একটি দেশে অবস্থান করছেন৷
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্নিগ্ধা রেজওয়ানা ডয়চে ভলেকে বলেন, ‘‘আসলে শিশুর এই যৌন শোষণকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক না দেখে সার্বিকভাবে দেখতে হবে৷ আমরা যদি শুধু মাদ্রাসার কথা বলি তাহলে সেখান থেকে এক ধরনের প্রতিরোধ তৈরি হয়৷ কারণ এরসঙ্গে আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে৷ ফলে বিষয়টি সার্বিকভাবে দেখলে কাজ করতে সুবিধা৷’’ তিনি বলেন, ‘‘মাদ্রাসায় যৌন হয়রানি নিয়ে আলাদাভাবে গবেষণার চেষ্টা যে হয়নি তা নয়, কিন্তু নানা প্রতিরোধের কারণে তা সফল হয়নি৷ একটি বই লেখা হয়েছিলো তাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷’’
মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ‘‘আমরা মাদ্রাসাগুলোতে এখন যৌন হয়রানির যে খবর পাচ্ছি তা বিস্ফোরণের মতো৷ এখানে শিশুরাই সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হচ্ছে৷ এগুলো প্রতিরোধে সরকারকে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে হবে৷ মাদ্রাসাগুলোতো ওপেন না, সেখানে কী ঘটে তা আমরা সবসময় জানতেও পারি না৷ তাই মাদ্রাসাগুলোকে ওপেন করে দিতে হবে৷ সেখানে স্বচ্ছতা আনতে হবে৷ আর আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে৷ উচ্চ আদালতের যে নির্দেশ আছে সেটা মেনে প্রত্যেক মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে কমিটি করতে হবে৷ ওই কমিটিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও রাখাতে হবে,’’ বলেন তিনি৷
মালেকা বানু বলেন, ‘‘মাদ্রাসাগুলোতে যারা পড়াশোনা করেন তাদের বড় একটি অংশ দরিদ্র ঘরের৷ এই দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে কোনোভাবে যৌন হয়রানি করা যাবে না৷ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মাদ্রাসা চলতে দেয়া যায় না৷’’

আইন কী বলে?
বাংলাদেশের আইনে এখন ছেলেকে বলাৎকারও ধর্ষণ বলে জানান সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান৷ আদালতে ধর্ষণ প্রমাণ হলে তার শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বলে জানান তিনি৷ কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ ঠিক মতো হচ্ছে না বা হওয়ার সুযোগ কম নানা জটিলতায়৷ তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে শিশু যৌন নির্যাতন উদ্বেগজনকহারে বেড়ে গেছে৷ এর কারণ হলো সব মাদ্রাসা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই৷ আবার আবাসিক মাদ্রাসার নামে যেখানে সেখানে বাড়ি ভাড়া করে মাদ্রাসা গড়ে তোলা হচ্ছে৷ আবার কোনো ঘটনা ঘটলে তা নানাভাবে ধামাচাপা দেয়া হয়৷ আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে যারা পড়েন তাদের অনেকেরই পরিবার দরিদ্র৷ ফলে তারাও খেয়াল রাখতে পারেন না৷ আর ধর্মের ভয় দেখিয়ে অনেক ঘটনা ভিন্ন খাতে নেয়া হয়৷ আমার পর্যবেক্ষণ হলো, সংবাদমাধ্যমে যে খবর আসছে মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের ঘটনা তার চেয়ে আরো অনেক বেশি ঘটছে৷ দেশের সব মাদ্রাসাকে সরকারের নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে৷ শিক্ষকদের নিবন্ধন থাকতে হবে,’’ বলেন তিনি৷
আরেক প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, ‘‘দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠন করতে হবে৷ কিন্তু যেখানে অনেক মাদ্রাসার নিবন্ধনই নেই সেখানে সেলের আশা করা যায় কীভাবে৷’’
সূত্র: ডয়েচেভেলে