অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দায়িত্ব পালনের সময়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পৌঁছেছে। ৩ সেপ্টেম্বর নথি তলব করে দুদকের চিঠির পর মন্ত্রণালয় থেকে অধিকাংশ নথি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব নথি যাচাই করে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে আইন ও বিধি মানা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনও পরীক্ষা করা হতে পারে।
দুদকের অনুসন্ধানের পাশাপাশি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে নতুন করে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও এসেছে। এসব অভিযোগ আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
যেসব নথি চেয়েছিল দুদক
৩ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির তথ্য এবং প্রশাসনিক রেকর্ডপত্র চায় দুদক। একই সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট দুটি স্মারকের মাধ্যমে হওয়া বদলির নথিও চাওয়া হয়। এ ছাড়া ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব দেওয়া, সেই দায়িত্ব বাতিল এবং পরবর্তী পদায়নসংক্রান্ত নথিও চাওয়া হয়। মাঠপর্যায়ে ঢাকা, বগুড়া, বরিশাল, পাবনা, ধামরাই ও নরসিংদীতে কর্মরত কয়েকজন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত অনুলিপিও চেয়েছিল কমিশন।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে চার সদস্যের বিশেষ অনুসন্ধান দল এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছে। অভিযোগের মধ্যে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়া, অনিয়মের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের বহাল রাখা এবং সংশ্লিষ্টদের ‘সুরক্ষাবলয়’ তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
নতুন করে যেসব অভিযোগ
এরই মধ্যে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসক পদায়ন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিদেশে অর্থ পাচারসংক্রান্ত নতুন অভিযোগ পেয়েছে দুদক। কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তানজির আহমেদ জানিয়েছেন, নতুন অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্ত করা হবে।
দুদকের কাছে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, চার দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। অভিযোগে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুবাইয়ে ওই অর্থের একটি অংশ দিয়ে ভিলা কেনা, ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রিন গ্রুপে’ মূলধন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অর্থ পাচারের অভিযোগ এখনো দুদকের অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা বা অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি কমিশন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং ৩৬ জন জেলা প্রশাসককে পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেন হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ ও প্রকল্পকে ঘিরেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রকল্প ও নিয়োগ ঘিরেও অভিযোগ
অভিযোগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও আনা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখনো প্রমাণিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে দুদক।
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের একটি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্য, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও সহকারীদের মাধ্যমে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।
আসিফের দাবি, অভিযোগের অঙ্ক নিয়ে বিভ্রান্তি
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ। রোববারের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, ১১ হাজার কোটি টাকা এবং ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার মতো ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কের অভিযোগ সামনে এসেছে। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁকে ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ মুখে ফেলা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, সরকার যদি কাউকে গ্রেপ্তার বা আইনি ব্যবস্থা নিতে চায়, তার নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার দুর্নীতির বিষয়ে দুদকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানকে তিনি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের আশঙ্কাও প্রকাশ করেন। তবে দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান চলছে। ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খানও আইন-বিধি অনুসরণ করেই অনুসন্ধান শুরুর কথা জানিয়েছিলেন।
নথি যাচাইয়ের পরই স্পষ্ট হবে চিত্র
দুদকের হাতে এখন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির গুরুত্বপূর্ণ নথি পৌঁছানোয় অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নথিগুলো যাচাই করে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো নিয়ম অনুযায়ী হয়েছিল কি না, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বেআইনি সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নথিপত্র যাচাইয়ের পর প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক লেনদেনও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে। ফলে অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্ত এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—তা পরবর্তী অনুসন্ধানেই স্পষ্ট হবে।