বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত ২২টি অনলাইন পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটর শনাক্ত করে সেগুলোর ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে বিষয়টি জানিয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকেও (বিএফআইইউ) চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন বিভাগ এসব প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুরোধের মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট বন্ধ করা এবং গুগল প্লে স্টোরে থাকা সংশ্লিষ্ট অ্যাপ সরিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
লাইসেন্সবিহীন ২২টি প্রতিষ্ঠান হলো—বহুদূর পে, জিনিপে, পে-টিলার, বেঙলি পে, পেওরা বিডি, সহজপে বিডি, ইজিপে ওয়ে, একে পে, বিডি পে, সাজঘর পে, আস্থা পে, উদ্যোক্তাপে, ওয়ালেটমিক্স, বিটিটি পে, ইজিপে অটোমেশন, ইউনিকপে বিডি, বিডি অটো পে, আরএইচ পে বিডি, ইজি পে, অটো পে লিমিটেড, বিশ্বস্ত ও পিপড়াপে। তালিকাভুক্ত ২২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ১৯টির ওয়েবসাইটে বিকাশ, নগদ, রকেট, বাংলা কিউআর এবং বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুবিধা দেখা গেছে। ফলে এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে আসা গ্রাহক ও মার্চেন্টদের জন্য ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, অননুমোদিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে গ্রাহকদের সতর্ক করা হচ্ছে। এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কেউ প্রতারণার শিকার হলে তার দায় বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে না। এ কারণেই ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধ এবং গুগল প্লে স্টোর থেকে অ্যাপ সরিয়ে নিতে বিটিআরসিকে অনুরোধ করা হয়েছে।
পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটর সাধারণত একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগ দেয়। ফলে একজন ব্যবসায়ীকে আলাদাভাবে প্রতিটি ব্যাংক, কার্ড নেটওয়ার্ক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সংযোগ স্থাপন করতে হয় না। এই ধরনের পেমেন্ট অবকাঠামো পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (PSO) হিসেবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা পরিচালনা করে। পেমেন্ট গেটওয়ে ও পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটরও এই নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় পড়ে। লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসার যৌক্তিকতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত বিবেচনা করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে গ্রাহক পরিচয় যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ, অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্তকরণ এবং অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের মতো নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন। কোনো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বা ব্যক্তিগত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) নম্বরে অর্থ গ্রহণ করলে সেই অর্থ নিয়ে আরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে তালিকাভুক্ত কিছু প্ল্যাটফর্ম যথাযথ মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের পরিবর্তে ব্যক্তিগত এমএফএস নম্বর ব্যবহার করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এতে প্রচলিত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেন পরিচালনার সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে আরও কিছু প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ভার্চুয়াল সম্পদের লেনদেনে সহায়তার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিটকয়েন, ইথেরিয়ামসহ এসব ভার্চুয়াল সম্পদের লেনদেন বাংলাদেশে অনুমোদিত নয়। তালিকাভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জুয়াসহ অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলেন, লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে কারা রয়েছে, কারা এগুলোর প্রচার করছে এবং এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হুন্ডি, অর্থপাচার বা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে কি না—তা তদন্ত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, শুধু ওয়েবসাইট বা অ্যাপ বন্ধ না করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ও অর্থের প্রবাহও তদন্তের আওতায় আনা দরকার।
এদিকে বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, অননুমোদিত কোনো পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটরের সঙ্গে বিকাশের লেনদেনের সুযোগ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে লাইসেন্স পেলেও তার সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেবা চালু হয় না; সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য আইন ও বিধিবিধান পরিপালনও যাচাই করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনা বা পেমেন্ট সেবা দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অনিয়ন্ত্রিত পেমেন্ট ব্যবস্থা গ্রাহক যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের কার্যক্রমকে দুর্বল করতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈধ লাইসেন্স নিয়ে ১১টি পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে লাইসেন্সবিহীন প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যক্রম বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।