পাইপলাইন সংস্কারের পর পাঁচটি কল শুকিয়ে গেছে, এক কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনছেন বাসিন্দারা; গঙ্গার দূষিত পানিতে নিত্যকাজ
কলকাতার উত্তরাঞ্চলের কাশীপুরের জ্যোতিনগর কলোনিতে একটি প্রশ্ন এখন প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে—পানি কোথায়? পাঁচটি সরকারি কল ছিল এই জনবসতির কয়েক হাজার মানুষের প্রধান ভরসা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখান থেকে পানি নিতেন বাসিন্দারা। কিন্তু প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে সেই কলগুলো শুকনো। রান্না, পান করা, গোসল, কাপড় ধোয়া—সবকিছুর জন্যই এখন বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে তাঁদের।
বাসিন্দাদের হিসাবে, ২৯ জুলাই রাতে পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর ৪৯ দিন ধরে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন ৪৬ দিন ধরে পাঁচটি কল থেকে পানি পাওয়া যাচ্ছিল না। অর্থাৎ সংকটটি এক মাসের সীমা পেরিয়ে এখন দীর্ঘস্থায়ী নাগরিক সেবা ব্যর্থতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ এই কলোনিতে প্রায় ৫ হাজার মানুষ বসবাস করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বড় অংশই নিম্নআয়ের মুসলিম পরিবার।
এই ঘটনার শুরু কোথায়, সেটিই এখন প্রথম প্রশ্ন। বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৬ থেকে ২৯ জুলাই কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (কেএমসি) কর্মীরা এলাকায় পানির পাইপলাইনের কাজ করেন। ২৯ জুলাই রাত পর্যন্ত পানি পাওয়া যাচ্ছিল। এরপর রাতের দিকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকাল থেকে পাঁচটি কল আর চালু হয়নি। আশপাশের কিছু এলাকায় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও জ্যোতিনগর কলোনির কলগুলো শুকনো পড়ে থাকে বলে বাসিন্দারা দাবি করেছেন।
পাইপলাইন সংস্কারের পর কোনো কারিগরি ত্রুটি হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে সেটি কেন এত দিনে মেরামত করা হয়নি—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তরই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দিক। কারণ একটি পাইপলাইন সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার পর সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট নাগরিক সংস্থার দায়িত্ব হওয়ার কথা সমস্যাটি শনাক্ত করা, বিকল্প সরবরাহ দেওয়া এবং দ্রুত মূল ব্যবস্থা সচল করা। কিন্তু জ্যোতিনগরে সেই স্বাভাবিক প্রতিকার কতটা হয়েছে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
বাসিন্দারা জানান, তাঁরা কেএমসি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন। লিখিত অভিযোগও দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের মাধ্যমে মাঝেমধ্যে পানির ট্যাংকার আনার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু প্রায় ৫ হাজার মানুষের জন্য কয়েক দিন পরপর একটি ট্যাংকার কতটা কার্যকর সমাধান দিতে পারে, সেটিও বড় প্রশ্ন। স্থানীয় সিপিআইএম নেতা আলমগীর বিশ্বাসের ভাষ্য, এক ট্যাংকার পানি পেতে তিন-চার দিন অপেক্ষা করতে হয় এবং প্রায় ৭০০ রুপি খরচ হয়; এত মানুষের জন্য তা পর্যাপ্ত নয়।
ফলে পানি সংগ্রহের সবচেয়ে বড় বোঝা গিয়ে পড়েছে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর। কারও পক্ষে পানি কিনে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না, আবার দূরের সরকারি কল থেকে পানি আনতে গিয়ে শ্রম ও সময় দুটোই ব্যয় হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক বাসিন্দাকে প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূর থেকে পানি বহন করে আনতে হচ্ছে। পানি সংগ্রহের জন্য নারীদের নিয়মিত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে—যে কাজ তাঁদের ঘরের অন্যান্য দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, বিকল্প হিসেবে হুগলি নদীর পানি ব্যবহার। জ্যোতিনগর গঙ্গার খুব কাছেই। ফলে পানি না থাকলে নদীই হয়ে উঠছে সহজলভ্য বিকল্প। কিন্তু নদীর পানি পান বা দৈনন্দিন গৃহস্থালির নিরাপদ ব্যবহারের জন্য উপযোগী নয়। প্রতিবেদনে শিশুদের নদীর ঘাটে গোসল ও মুখ ধোয়ার কথাও এসেছে। কয়েকজন বাসিন্দা শিশুদের নদীতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকির কথাও জানিয়েছেন।
এখানেই সংকটটি কেবল ‘পাইপলাইন মেরামতের সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। পানি সরবরাহ বন্ধ থাকার সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, শিশুদের নিরাপত্তা, নারীদের চলাচল এবং নিম্নআয়ের পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িয়ে পড়েছে। কলকাতার বস্তি এলাকায় পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০২০ সালের একটি গবেষণায় কলকাতার বস্তিগুলোতে পানির সরবরাহের নিয়মিততা, মান ও পরিমাণে ঘাটতি এবং বিদ্যমান পানি-স্যানিটেশন অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে জ্যোতিনগরের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও জটিল। বাসিন্দাদের বড় অংশ মুসলিম হওয়ায় তাঁরা পানি বন্ধের ঘটনাকে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক ঋতেশ তিওয়ারির নির্বাচনী বক্তব্যের পরই তাঁরা এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। বিধায়কের একটি প্রকাশ্য বক্তব্যের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, যেখানে তিনি মুসলিমদের জন্য কাজ না করার কথা বলেছিলেন। এই বক্তব্যের সঙ্গে পানি বন্ধের ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র আছে—এমন অভিযোগ অবশ্য বাসিন্দাদের; এটি স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে ধরা যায় না।
আরও একটি বিষয় এই অভিযোগকে জটিল করেছে—জ্যোতিনগর কলোনির জমির মালিকানা ও উচ্ছেদ নিয়ে চলমান বিরোধ। আল্ট নিউজের অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রায় ৩ হাজার ৪৭৮ বর্গমিটার জমি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্টের মালিকানাধীন বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ আছে। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি বন্দর কর্তৃপক্ষের এস্টেট কর্মকর্তা ‘Public Premises (Eviction of Unauthorised Occupants) Act, 1971’-এর আওতায় উচ্ছেদের আদেশ জারি করেন বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে বাসিন্দারা আদালতের দ্বারস্থ হন।
এই তথ্য পরিস্থিতিটিকে নতুন মাত্রা দেয়। পানি সরবরাহ বন্ধ কি নিছক পাইপলাইন-সংক্রান্ত কারিগরি সমস্যা, নাকি উচ্ছেদ-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু এই দুটি ঘটনা একই এলাকায় একই সময়ে সামনে আসায় প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যার প্রয়োজন আরও বেড়েছে।
বিশেষ করে যদি জমিটি নিয়ে উচ্ছেদ-সংক্রান্ত আইনি বিরোধ থেকেই থাকে, তাহলে বাসিন্দাদের মৌলিক নাগরিক সেবা বন্ধ রাখার আইনগত ভিত্তি কী—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উচ্ছেদ নিয়ে মামলা চলতে পারে, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিরোধের মধ্যেও হাজারো মানুষের নিরাপদ পানির প্রয়োজন কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে—তার জবাব প্রশাসনকে দিতে হবে।
আইনি লড়াইও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্ছেদ ঠেকাতে বাসিন্দারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন এবং ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উচ্ছেদের ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারের দাবিতেও পৃথক আইনি পদক্ষেপের কথা জানা গেছে। অর্থাৎ বিষয়টি এখন শুধু স্থানীয় অভিযোগের পর্যায়ে নেই; নাগরিক সেবা ও বসবাসের অধিকার নিয়ে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই প্রশাসনিক জবাবদিহির। ২৯ জুলাই পাইপলাইন সংস্কারের পর পানি বন্ধ হয়ে থাকলে ৪৯ দিনেও কেন সমস্যা শনাক্ত ও সমাধান হলো না? যদি পাইপলাইন কেটে দেওয়া হয়ে থাকে, কে বা কারা তা করেছে? যদি কারিগরি ত্রুটি হয়ে থাকে, মেরামতের কাজ কোথায় আটকে আছে? যদি জমি বা উচ্ছেদ নিয়ে বিরোধের কারণে পানি সরবরাহে কোনো পরিবর্তন আনা হয়ে থাকে, তার লিখিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কোথায়? আর যদি কোনো সিদ্ধান্তই না হয়ে থাকে, তাহলে একটি জনবসতির পাঁচটি সরকারি কল একসঙ্গে এত দীর্ঘ সময় অচল কেন?
আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ—স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কেএমসি এবং প্রশাসনের কাছে বারবার অভিযোগ যাওয়ার পরও কেন স্থায়ী বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? কয়েক হাজার মানুষের জন্য নিয়মিত পানির ট্যাংকার, অস্থায়ী পাইপলাইন কিংবা অন্য কোনো নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা যেত কি না, সেটিও এখন তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পরও সংকট চলতে থাকা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হলে কেএমসির পানি সরবরাহ বিভাগের নথি, ২৬–২৯ জুলাইয়ের পাইপলাইন সংস্কারের ওয়ার্ক অর্ডার, কাজ শেষ হওয়ার প্রতিবেদন, পানি সরবরাহ বন্ধের প্রকৌশলগত কারণ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের লিখিত যোগাযোগ এবং উচ্ছেদ মামলার নথি—সব একসঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কারণ এখানে শুধু একটি বস্তির পানি বন্ধ থাকার ঘটনা নেই। প্রশ্নটি হলো, একটি দরিদ্র জনবসতিতে নাগরিক সেবা কতটা নির্বিচারে বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং সেই সেবা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের জবাবদিহি কোথায়। পানি যে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, সেটি নিয়ে বিতর্ক নেই। বিতর্ক এখন অন্য জায়গায়—জ্যোতিনগরের পাঁচটি কল শুকিয়ে থাকার ৪৯ দিনের দায় শেষ পর্যন্ত কার?
বাসিন্দাদের দাবি, তাঁরা কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি চান না; চান কলের পানি। তাঁরা চান নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা এবং কেন এত দিন ধরে পানি নেই, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা। সেই ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত জ্যোতিনগরের পানির সংকট শুধু তৃষ্ণার গল্প হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে থাকবে প্রশাসনিক জবাবদিহির একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন।