চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আন্দোলন ১৬তম দিনে গড়িয়েছে। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৮৭ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সেপ্টেম্বরের বেতন ও উৎসব ভাতা আটকে গেছে। উপাচার্যের পূর্বানুমোদন ছাড়া বেতন-ভাতার বিল, চেক ও অর্থ ছাড়ের নির্দেশপত্র (ডিসবার্সমেন্ট অ্যাডভাইস) ব্যাংকে পাঠানোর অভিযোগ তুলে অর্থ ছাড় স্থগিত রাখতে সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখাকে নির্দেশ দিয়েছেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম।
এতে দুর্গাপূজার আগে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি অংশ আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বেতন আটকে দেওয়ার পেছনে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ তৈরির অভিযোগ অস্বীকার না করে উপাচার্য জানিয়েছেন, তাঁর অনুমোদন ছাড়া আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সম্ভাব্য অনিয়ম ও আইনি জটিলতা এড়াতেই তিনি ব্যাংককে অর্থ ছাড় না দিতে বলেছেন।
চুয়েটে বর্তমানে ৩৬৭ জন শিক্ষক, ২০৮ জন কর্মকর্তা এবং ৫১২ জন কর্মচারী রয়েছেন। ৬ অক্টোবর সোনালী ব্যাংক পিএলসির চুয়েট শাখার ব্যবস্থাপক জয়ন্ত ভৌমিককে পাঠানো ই-মেইলে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম জানান, ২৮ সেপ্টেম্বর কম্পট্রোলার দপ্তরের ১১ কর্মকর্তাকে বেতন-ভাতা বিতরণের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে জরুরি সভায় ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের কেউ সভায় উপস্থিত হননি।
পরে কম্পট্রোলার দপ্তরের দুই কর্মকর্তা উপাচার্যের পূর্বানুমোদন ছাড়াই সেপ্টেম্বরের বেতন ও উৎসব ভাতার বিল, চেক এবং অর্থ ছাড়ের নির্দেশপত্র ব্যাংকে পাঠান বলে ই-মেইলে উল্লেখ করেন তিনি।
চুয়েট আইন, ২০০৩-এর ১১(১২) ধারার উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, তাঁর পূর্বানুমোদন ছাড়া বেতনের বিল ব্যাংকে পাঠানো ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’। তাই তাঁর স্বাক্ষর ও দাপ্তরিক সিলযুক্ত লিখিত অনুমোদন ছাড়া কোনো অর্থ ছাড় না করতে ব্যাংক ব্যবস্থাপককে নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
উপাচার্যের নির্দেশ অমান্য করে অর্থ ছাড় করা হলে ব্যাংকও অননুমোদিত আর্থিক লেনদেনের দায়ে পড়তে পারে বলে ই-মেইলে সতর্ক করা হয়।
এর পরই বেতন-ভাতা ছাড়ের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখে সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখা। শাখা ব্যবস্থাপক জয়ন্ত ভৌমিক বলেন, কম্পট্রোলার ও ডেপুটি কম্পট্রোলারের স্বাক্ষর করা বেতন-ভাতার কাগজপত্র নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকে এসেছে। প্রতি মাসেই এভাবেই কাগজপত্র আসে।
তিনি বলেন, ‘গত ২৯ সেপ্টেম্বর বেতন-ভাতা ছাড়ের বিষয়ে নতুন উপাচার্যের কাছ থেকে একটি ই-মেইল আসে। এরপর কম্পট্রোলার ও ডেপুটি কম্পট্রোলারের স্বাক্ষর করা কাগজপত্র পাওয়ার পর আমরা ৬ অক্টোবর বর্তমান উপাচার্যকে ই-মেইল করি। উপাচার্য অর্থ ছাড়ে নিষেধ করায় আমরা তা স্থগিত রেখেছি।’
ব্যাংক ব্যবস্থাপক আরও জানান, উপাচার্যের নির্দেশ পাওয়ার পর অর্থ ছাড় বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আইনগত মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে চুয়েট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী সৈয়দ মোহাম্মদ ইকরাম দাবি করেছেন, নিয়মিত মাসিক বেতন দেওয়ার জন্য প্রতি মাসে উপাচার্যের আলাদা স্বাক্ষরের প্রয়োজন নেই। তাঁর ভাষ্য, নিয়োগ, পদোন্নতি বা আপগ্রেডেশনের সময় নতুন পে ফিক্সেশন হলে উপাচার্যের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন না হলে আগের অনুমোদিত পে ফিক্সেশন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন দেওয়া যায়।
ইকরাম বলেন, সেপ্টেম্বরের বেতন ও উৎসব ভাতার বিল কম্পট্রোলার ও ডেপুটি কম্পট্রোলার স্বাক্ষর করে ব্যাংকে পাঠিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তাঁদের ওপর প্রশাসনিক চাপ তৈরির জন্যই বেতন আটকে রাখা হয়েছে।
চুয়েটে উপাচার্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন। এর দুই দিন পর ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে যোগ দেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনরায় উপাচার্য পদে বহাল করতে হবে।
চলতি বছরের ২৭ জুলাই চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে ২১ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর প্রতিবাদেই পরদিন থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে এতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও যুক্ত হন। দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থার মধ্যেই এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত বেতন ও উৎসব ভাতা নিয়ে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে।
নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘আমি কম্পট্রোলারসহ সংশ্লিষ্টদের সভার জন্য ডেকেছিলাম। কিন্তু তাঁরা কেউ আসেননি। পরে আমি ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে মেইল দিয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে, এই লেনদেনের ফলে কোনো আর্থিক অনিয়ম, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা আইনি জটিলতা সৃষ্টি হলে এর জন্য উপাচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো আইনগত, প্রশাসনিক বা আর্থিক দায়ভার বহন করবে না। এই মেইল দেখেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বেতন স্থগিত রেখেছে।’
চুয়েটের অচলাবস্থার মধ্যে বেতন-ভাতা আটকে যাওয়ায় এখন একদিকে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে উপাচার্য ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আর্থিক অনুমোদন ও আইনগত প্রক্রিয়ার প্রশ্ন তুলেছে। ফলে বেতন ছাড়ের বিষয়ে প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আর্থিক দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।