অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন কড়াকড়ি দেখা দিয়েছে। দেশটির বাইরে থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করা বাংলাদেশিদের ভিসা মঞ্জুরের হার আগস্টে নেমে এসেছে মাত্র ২৪ শতাংশে। একই মাসে বাংলাদেশ থেকে করা আবেদনের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৮৩ শতাংশ এবং মঞ্জুর হওয়া ভিসার সংখ্যা ৯৩ শতাংশ কমেছে। অস্ট্রেলিয়ার ২১ বছরের ভিসা-তথ্য বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ এসব তথ্য জানিয়েছে।
এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা আরও কঠোর করেছে। সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশকে উচ্চঝুঁকির তৃতীয় স্তরে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, নেপাল, ফিলিপাইন, কলম্বিয়া ও পাকিস্তানও উচ্চঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। টাইমস হায়ার এডুকেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ১০টি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী উৎস দেশের মধ্যে চীন এখন নিম্নঝুঁকির প্রথম স্তরে রয়েছে; ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কা রয়েছে মাঝারি ঝুঁকির স্তরে।
ঝুঁকি রেটিংয়ের এই শ্রেণিবিন্যাস সরাসরি কোনো দেশের নাগরিকের ভিসা আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাখ্যানের অর্থ নয়। বরং আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা, পড়াশোনার উদ্দেশ্য, ইংরেজি ভাষাগত সক্ষমতা এবং আবেদনকারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কতটা বিস্তারিত প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে, তার ওপর এ ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রভাব রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। আগস্টে বাংলাদেশিদের উচ্চশিক্ষা ভিসা মঞ্জুরের হার ২৪ শতাংশে নেমে যাওয়াকে ওই মাসের জন্য রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ের ফল হিসেবে উল্লেখ করেছে টাইমস হায়ার এডুকেশন। একই সময়ে নেপালের আবেদনকারীদের মঞ্জুরের হার ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ এবং ভুটানের ৩৪ শতাংশ।
শুধু বাংলাদেশ নয়, অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ভিসা পাওয়ার সামগ্রিক হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। টাইমস হায়ার এডুকেশনের ২১ বছরের তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য ভিসা পাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১০ সালের পর ওই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে—২০২১ সালের সীমান্ত বন্ধের সময়টিকে বাদ দিলে। গত বছরের আগস্টের তুলনায় ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা মঞ্জুরের সংখ্যা যথাক্রমে ৬৬, ৮৯ ও ৯৩ শতাংশ কমেছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার অবশ্য ভিসা প্রত্যাখ্যান বাড়ানোর বিষয়টিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আবেদনকারীদের প্রকৃত শিক্ষার্থী হওয়ার উদ্দেশ্য এবং আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের সঙ্গে যুক্ত করছে। দেশটির ভিসা ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘জেনুইন স্টুডেন্ট’ বা প্রকৃত শিক্ষার্থী হওয়ার বিষয়টি যাচাইয়ে গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। ভিসা আবেদনে শিক্ষার্থীর পড়াশোনার পরিকল্পনা, আর্থিক সামর্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি যাচাই করা হচ্ছে।
এই কড়াকড়ির প্রভাব অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতেও পড়ছে। নতুন ঝুঁকি মূল্যায়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রেণিবিন্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। টাইমস হায়ার এডুকেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্বিতীয় স্তরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৩ থেকে বেড়ে ২২ হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী বাছাই ও ভিসা প্রক্রিয়ার ওপর প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতারও প্রভাব পড়তে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের গুরুত্বও কম নয়। দেশটির শিক্ষা বিভাগের সর্বশেষ জুন ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৮১০ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছিলেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মোট আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে চীন, ভারত, নেপাল, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ—এই পাঁচটি দেশ থেকেই এসেছেন মোট আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ৫৭ শতাংশ। বাংলাদেশ এককভাবে প্রায় ৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর উৎস।
অর্থাৎ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ভিসা নীতিতে পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত শিক্ষার্থীদের ওপর নয়, দুই দেশের শিক্ষা-সম্পর্ক এবং অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা বাজারের ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে আবেদন কমে যাওয়া এবং ভিসা মঞ্জুরের হার কমে যাওয়ার কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীসহ দক্ষিণ এশিয়ার বাজার থেকে নতুন শিক্ষার্থী সংগ্রহে চাপের মুখে পড়তে পারে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার স্টুডেন্ট ভিসা ব্যবস্থায় আরও কিছু পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর থেকে সাবক্লাস ৫০০ স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ও মঞ্জুরের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে। অধিকাংশ নতুন আবেদন অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে করার বিধান করা হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যদের একই ভিসা আবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের জুলাই থেকে অধিকাংশ স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা ব্যবস্থাকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবে পুনর্বিন্যাস করছে।
তবে উচ্চঝুঁকির তৃতীয় স্তরে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা পাওয়া অসম্ভব—এমন কোনো সরকারি বিধান নেই। ঝুঁকি রেটিং একটি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো; ব্যক্তিগত আবেদন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতা, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা আবেদনকারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তারপরও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার পথ যে আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র দিচ্ছে। বিশেষ করে আগস্টের ২৪ শতাংশ ভিসা মঞ্জুরের হার এবং আবেদনে ৮৩ শতাংশ পতন দেখাচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার পরিবর্তিত অভিবাসন নীতির প্রভাব বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। আগামী মাসগুলোতে এই হার ও ঝুঁকি শ্রেণিবিন্যাসে কী পরিবর্তন আসে, সেটিই এখন অস্ট্রেলিয়ামুখী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও দেশের শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।