- কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘উনি যেসব অভিযোগ করেছেন, সেগুলো সঠিক নয়’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দীন তানভীর পুলিশ হেফাজত ও কারাবাসে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁকে অসংখ্য ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে এবং একপর্যায়ে শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে তাঁর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তানভীর অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। এসব কিসের ইনজেকশন তা আমি জানি না। অন্তত ৭০-৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে আমাকে। সারাক্ষণ জ্বর থাকত, আর তারা আমাকে ইনজেকশন দিত।’ তাঁর দাবি, একদিন হাত-পা কাঁপতে শুরু করলে একজন চিকিৎসক তাঁকে ইনজেকশন দেন। এরপর তাঁর ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায়। পরে তাঁকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে স্ট্রোক হয়েছে বলে জানান বলে দাবি করেন তানভীর। তবে কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অস্বীকার করে।
কারাগারে খাবার ও চিকিৎসা নিয়েও অভিযোগ করেন এনসিপির সাবেক এই নেতা। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট কারাগারে নেওয়ার পর তাঁকে দুই দিনের বাসি খাবার দেওয়া হয়। ওই খাবার খেয়ে তাঁর ডায়রিয়া হয়। চিকিৎসার জন্য শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ না দিয়ে অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
তানভীর আরও বলেন, হাসপাতালে তাঁর সিটি স্ক্যান করা হলেও প্রতিবেদনে কী এসেছে, তা তাঁকে জানানো হয়নি। পরে এমআরআই করার সময় যন্ত্রের ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট শব্দ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি। এরপর কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে গিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অচেতন ছিলেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন তিনি।
পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হয় বলে জানান তানভীর। তাঁর ভাষ্য, ঢাকায় কেরানীগঞ্জে রাখার পরও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া-আনা করা হতো। একপর্যায়ে হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কারাগারে ফেরার পথে সাদা পোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি গাড়িতে উঠে তাঁকে নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তানভীরের দাবি, ওই ব্যক্তিরা বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক আহমেদ আকবর সোবহান ও তাঁর ছেলে আনভীর সোবহানের প্রসঙ্গ তুলে তাঁকে নির্যাতন করেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।
কারাগারে থাকা অবস্থায় আরও কয়েক দফা নির্যাতনের অভিযোগ করেন তানভীর। তাঁর দাবি, একটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে তাঁকে নির্যাতনের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম উল্লেখ করা হতো। এ সময় জুলাইয়ের আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদেরও একইভাবে নির্যাতন করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাঁর।
কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও করেন তানভীর। তাঁর দাবি, তিনি কারাগারে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে নিয়মিত ফোনে কথা বলতে এবং ভালো খাবার খেতে দেখেছেন। রাতের বেলায় তাঁদের গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো বলেও দাবি করেন তিনি। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ তিনি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করেননি।
তানভীরকে গত ৫ আগস্ট ঢাকার পূর্ব মনিপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর ও মানহানিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়। মামলাটি করেন বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান। ১০ আগস্ট তাঁকে এক দিনের রিমান্ডে নেয় বগুড়া সদর থানা পুলিশ। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি পুলিশ হেফাজত ও কারাগারে ছিলেন বলে জানান।
তবে রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী। তিনি বলেন, ‘তাকে থানায় কোনো নির্যাতন করা হয়নি। আমরা আদালতের মাধ্যমে তাকে সসম্মানে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছি।’
তানভীরকে পুলিশ হাসপাতালে নেয়নি বলেও জানান ওসি। তাঁর ভাষ্য, হাসপাতালে তাঁকে কী ধরনের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশের জানা নেই।
কারাগারে নির্যাতন ও চিকিৎসা নিয়ে তানভীরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বগুড়া জেলা কারাগারের জেল সুপার আসাদুর রহমানও। তিনি বলেন, ওই বন্দিকে কারাগারে কোনো ইনজেকশন দেওয়া হয়নি। অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে ওষুধ দেওয়া হয়েছে এবং শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাসি খাবার ও কারারক্ষীদের দুর্ব্যবহারের অভিযোগও নাকচ করেছেন জেল সুপার। তাঁর দাবি, ‘জেলে ওনার সেবার কোনো কমতি ছিল না।’
আসাদুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পর কারাগারে থাকা অনেক বন্দিই আগের সরকারের ‘সুবিধাভোগী’ এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ছিলেন। এ কারণে তানভীরকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখার পাশাপাশি তাঁর জন্য বিশেষভাবে দেখভালের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
জেল সুপারের ভাষ্য, ‘উনি যেসব অভিযোগ করেছেন, সেগুলো সঠিক নয়।’
তানভীর সংবাদ সম্মেলনে তাঁর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। একই সঙ্গে কারাগারে তাঁর চিকিৎসা, হাসপাতালে নেওয়া-আনা এবং কথিত নির্যাতনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার কথা জানান।
তবে তাঁর করা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্ত বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে পুলিশ হেফাজত ও কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অস্বীকার—দুই পক্ষের বক্তব্যই আপাতত পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হচ্ছে।