সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশে স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ গঠন করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে নতুন এই ইউনিট গঠনের কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ইউনিটটির কার্যক্রম পরিচালনায় পুলিশ সদর দপ্তরে অতিরিক্ত আইজিপির পদ প্রয়োজন হলে তা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত পদক প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের সব মেট্রোপলিটন এলাকা, বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে এ ইউনিটের শাখা থাকবে। পাশাপাশি থানা ও জেলা পর্যায়েও সাইবার অপরাধ শনাক্ত, তদন্ত ও বিশ্লেষণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। তিনি বলেন, সাইবার অপরাধের ধরন ও জটিলতা বিবেচনায় কাজের দায়িত্ব বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে দেওয়া হবে। যেসব অপরাধ বা ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ স্থানীয় পর্যায়ে করা সম্ভব, সেগুলো থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েই সম্পন্ন করা হবে। আর যেসব ঘটনা অধিক জটিল কিংবা উন্নত প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের প্রয়োজন হবে, সেগুলো কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পাঠানো হবে।
এ জন্য পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভাগীয় পর্যায়ে বড় আকারের ফরেনসিক ল্যাব স্থাপনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, নতুন কাঠামোর মাধ্যমে সাইবার অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর পুলিশ স্টাফ কলেজের পরিচালনা বোর্ডের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার। সে সময় তিনি বলেছিলেন, পুলিশ বাহিনীতে প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার সায়েন্সের দক্ষতা থাকা সদস্যদের কাজে লাগানো হবে।
এর ধারাবাহিকতায় ১৬ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট ও ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান।
গত ২১ সেপ্টেম্বরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সাইবার অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা নিতে সিআইডির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল চীন সফর করবে বলেও জানানো হয়।
নতুন ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে সাইবার অপরাধ তদন্তে বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা সক্ষমতাগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ডিজিটাল ফরেনসিক, অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং, পরিচয় চুরি, আর্থিক সাইবার অপরাধ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের তদন্তে বিশেষায়িত জনবল ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ে অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের পরিধিও বাড়ছে। ফলে এসব অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের প্রচলিত সক্ষমতার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং উন্নত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
তিনি জানান, নতুন সাইবার সিকিউরিটি ইউনিটের প্রকল্প প্রণয়নের জন্য কয়েক সপ্তাহ আগেই সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন্দ্র থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে।
পুলিশে জনবল নিয়োগের বিষয়েও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মকর্তা ও অন্যান্য পদে ব্যাপক হারে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
পুলিশকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের পাশাপাশি পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা। মানুষের আস্থা অর্জন ছাড়া কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থাই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ পুলিশ অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের দক্ষ ও নিষ্ঠাবান সদস্যরা বাহিনীটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবেন। একই সঙ্গে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং সদস্যদের কল্যাণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।
নতুন সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট কার্যকর হলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পাশাপাশি মেট্রোপলিটন, বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়েও সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে বলে সরকারের পরিকল্পনা থেকে জানা যাচ্ছে। তবে ইউনিটটির পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো, জনবল, বাজেট এবং দায়িত্ব বণ্টনের বিস্তারিত রূপরেখা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।