জামিন পাওয়ার পরও কারাগার থেকে মুক্তি না দেওয়া, জেলগেট থেকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো কিংবা কারাগারে থাকা অবস্থায় নতুন মামলায় আসামি করার অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এমন কয়েকটি ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—আদালত যখন কোনো মামলায় একজন আসামিকে জামিন দিয়ে মুক্তির নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন অন্য মামলার অজুহাতে তার মুক্তি আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন কতটা অনুমতি দেয়।
আইনজীবীদের মতে, কারাগারে থাকা কোনো ব্যক্তিকে অন্য মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখানোর একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধিত বিধানটি ২০২৬ সালে আইন হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে। সরকারি আইনে নতুন করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭(এ) ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে শ্যোন অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করতে হবে। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ওই মামলার কেস ডায়েরির সংশ্লিষ্ট অংশ আদালতে উপস্থাপন করতে হবে এবং আসামিকে নিজের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এরপর আবেদনটি যথেষ্ট ভিত্তিসম্পন্ন মনে হলেই আদালত শ্যোন অ্যারেস্টের আবেদন অনুমোদন করতে পারেন। অর্থাৎ, শুধু একটি নতুন মামলা দায়ের হয়েছে—এই কারণেই কারাগারে থাকা কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর সুযোগ নেই। আদালতের সামনে নতুন মামলায় গ্রেপ্তারের প্রয়োজনীয়তা ও ভিত্তি উপস্থাপন করার বিষয়টি আইনে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হয়েছে।
এই বিধানের বাস্তব প্রয়োগ নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। ঢাকায় ২০২৫ সালের মার্চে গ্রেপ্তার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ‘আহসান আহমেদ’ (ছদ্মনাম) দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে থাকা দুটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পাননি। মুক্তির প্রস্তুতির সময় কারাগারের একজন কর্মী তাকে অন্য একটি থানায় করা নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কাগজ দেন। পরে আরও কয়েক দফা জামিন নেওয়ার পর নতুন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। শেষ পর্যন্ত পঞ্চমবারের চেষ্টায় তিনি কারাগার থেকে বের হতে পারেন। তার দাবি, গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রায় দেড় বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী ‘আশিকুর রহমান’ (ছদ্মনাম) জানিয়েছেন ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা। একটি নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তারের পর ৭২ দিনের মাথায় তিনি নিম্ন আদালত থেকে জামিন পান। কিন্তু কারাগার থেকে বের হওয়ার পরপরই সাদা পোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি তাকে আটক করেন বলে তার দাবি। পরে অন্য একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—জামিনের আদেশের পরও কি একই ব্যক্তিকে অন্য মামলায় আটক রাখার সুযোগ রয়েছে?
অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শাহজাহানের মতে, জামিনের পর শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর সুযোগ নেই। তার ব্যাখ্যা, কোনো আসামির বিরুদ্ধে অন্য মামলায় বৈধভাবে গ্রেপ্তার না থাকলে আদালত জামিন দেওয়ার পর তাকে মুক্তি দিতে হবে।
তবে এখানে একটি আইনি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। ‘জামিন পাওয়া’ আর ‘সব মামলায় জামিন পাওয়া’ এক বিষয় নয়। একজন আসামি একটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য কোনো মামলায় বৈধ গ্রেপ্তার বা আটকাদেশ থাকলে তিনি মুক্তি নাও পেতে পারেন। কিন্তু নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়াটি আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটিই হয়ে ওঠে মূল প্রশ্ন।
২০২৬ সালের সংশোধিত আইনের ১৬৭(এ) ধারায় বলা হয়েছে, অন্য মামলায় আগে থেকেই হেফাজতে থাকা কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন এলে তাকে আদালতে হাজির না করে এবং সংশ্লিষ্ট মামলার কেস ডায়েরির অংশ উপস্থাপন ও শুনানির সুযোগ না দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সেই আবেদন অনুমোদন করতে পারবেন না।
এ ছাড়া একই সংশোধনীতে গ্রেপ্তারের বিধান না মানার বিষয়েও আদালতের নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইনের ৬৭(এ) ধারায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার পর সংশ্লিষ্ট আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেপ্তারের বিধান যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করবেন। বিধান লঙ্ঘন হয়ে থাকলে লিখিত কারণ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।
ফলে শ্যোন অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে এখন শুধু পুলিশের আবেদনই যথেষ্ট নয়; আদালতেরও নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে।
তবে বাস্তবে নতুন মামলা দায়ের করে জামিনপ্রাপ্ত বা জামিনের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিকে পুনরায় আটক রাখার অভিযোগ উঠছে। কুষ্টিয়ার একটি ঘটনায় এমন অভিযোগ করেছেন ওয়াসিম আকরাম। তার দাবি, জেলা কারাগারে থাকা তার বাবা করিম প্রামাণিকসহ আটজন একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর নতুন একটি নাশকতার মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
ওয়াসিমের দাবি, আসামিদের কারাগার থেকে স্বাভাবিকভাবে বের হতে দেওয়া হয়নি; বরং কারাগারের ভেতর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিয়ে যান এবং পরে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তবে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জাকির হোসেন কারাগারের ভেতর থেকে আটকের অভিযোগ নাকচ করেছেন। মামলার এজাহারে যেভাবে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে, সেটিই সঠিক বলে তিনি দাবি করেছেন।
অন্যদিকে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. শরিফুল আলম বলেছেন, আসামিদের কারাগারের ভেতর থেকে নেওয়া হয়নি; তাদের কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর পুলিশ গেট এলাকা থেকে নিয়ে গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারের ভেতরে ঢুকে আসামিদের নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
দুই পক্ষের এই বক্তব্যের মধ্যেই মূল প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে—আসামিরা ঠিক কোথায় এবং কীভাবে পুলিশের হেফাজতে গেলেন এবং নতুন মামলায় যে স্থানে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল কতটা।
আইন বিশেষজ্ঞদের কাছে এ প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া এখন আইনে স্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত। ১৬৭(এ) ধারায় আদালতে আসামির উপস্থিতি, কেস ডায়েরি এবং শুনানির সুযোগ—তিনটিকেই গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে।
এ কারণে কোনো ব্যক্তিকে জামিনের পর মুক্তি না দিয়ে নতুন মামলায় আটক রাখা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে শুধু মামলার এজাহার দেখাই যথেষ্ট নয়। আদালতের আদেশ, গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন, কেস ডায়েরি, আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল কি না এবং বিচারকের আদেশ—সবগুলো নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আইনি বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব ঘটনার তদন্তেও এই নথিগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ নতুন মামলা করা আইনত সম্ভব হলেও, সেই মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রচলিত আইনের শর্ত মেনে হতে হবে।
সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো তাই শুধু ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ ব্যবহারের প্রশ্ন নয়; বরং জামিনের পর একজন নাগরিকের মুক্তির অধিকার, আদালতের আদেশের কার্যকারিতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আনছে।
আইনটি আদালতের জন্য যেমন নির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে, তেমনি গ্রেপ্তারের বৈধতা যাচাইয়ের সুযোগও দিয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তিকে জামিনের পরও আটক রাখার ঘটনা ঘটলে তার বৈধতা নির্ধারণের মূল জায়গা হওয়া উচিত আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া—শুধু পুলিশ বা আসামিপক্ষের বক্তব্য নয়।
আইনের চোখে একটি মামলা নতুন করে দায়ের হওয়া এবং সেই মামলায় একজন ব্যক্তিকে বৈধভাবে গ্রেপ্তার দেখানো—দুটি আলাদা বিষয়। জামিনের পর কারাগারের দরজা কারও জন্য খুলবে কি না, শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে তিনি অন্য কোনো মামলায় বৈধভাবে আটক আছেন কি না এবং নতুন মামলায় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না তার ওপর।