- হান্নান মাসউদের উস্কানিমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে হাতিয়ায় উত্তেজনা, এমপির ঘাড়ে ঘুষি লাগার অভিযোগ
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সমর্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত আটজন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা পরিষদের সামনে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় বাগ্বিতণ্ডা, ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির পর এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও স্থানীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হান্নান মাসউদ হাতিয়া সরকারি দ্বীপ কলেজে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় যোগ দিতে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলা পরিষদ ভবনের সামনে পৌঁছান। এর আগে থেকেই সেখানে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান করছিলেন। এমপির সঙ্গে থাকা এনসিপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে হান্নান মাসউদও তর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে উপজেলা প্রশাসনের মধ্যস্থতায় তাঁকে সভাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সম্প্রতি জাতীয় সংসদ অধিবেশন, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা ও দলীয় কর্মসূচিতে হান্নান মাসউদ বিএনপিকে নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। এসব বক্তব্যকে তাঁরা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে আসছিলেন। এ নিয়ে আগে থেকেই স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। গত ৫ সেপ্টেম্বরও তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে হাতিয়া বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করেছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সভা চলাকালে উপজেলা পরিষদের বাইরে এনসিপি ও ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আবারও উত্তেজনা দেখা দেয়। খবর পেয়ে হান্নান মাসউদ সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে আবার বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতি ও মারামারিতে গড়ায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও হস্তক্ষেপ করতে হয়।
ঘটনায় উপজেলা যুবশক্তির সদস্যসচিব সাইফুল ইসলাম এবং ছাত্রদল নেতা আকরাম, সাকিব, সাখাওয়াত হোসেন ও আজাদসহ অন্তত আটজন আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন বলেন, সংসদ সদস্য সভায় যাওয়ার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে উপজেলা পরিষদের ফটকে উচ্চবাচ্য ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে প্রশাসনের সহযোগিতায় সংসদ সদস্যকে নিরাপদে তাঁর বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এনসিপির হাতিয়া উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক শামসুদ্দিন তিবরিজ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। তাঁর অভিযোগ, বিনা কারণে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। তিনি ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বলেও দাবি করেন। তবে তাঁর এ বক্তব্যের স্বাধীন কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে হাতিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিরুল হায়দার চৌধুরী বলেন, হান্নান মাসউদ বিভিন্ন স্থানে বিএনপিকে জড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সেই ক্ষোভ থেকেই নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তবে এ ঘটনায় বিএনপির কোনো দলীয় নির্দেশনা ছিল না।
হাতিয়া পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশিক ইকবালও বলেছেন, হান্নান মাসউদের বক্তব্য নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা সভার ঘটনাকে বিএনপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি।
সংঘর্ষের বিষয়ে সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, তিনি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে বিএনপির লোকজন হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। তাঁর অভিযোগ, এ সময় বিএনপির লোকজনের একটি ঘুষি তাঁর ঘাড়ে লাগে।
ঘটনার পর প্রশাসনের কর্মকর্তারা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা দুই পক্ষকে সরিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। পরে হান্নান মাসউদকে তাঁর বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য আয়োজিত একটি সরকারি সভাকে ঘিরে দুই রাজনৈতিক পক্ষের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় হাতিয়ায় নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।