- ভিডিওতে সমর্থকদের অস্ত্র তৈরির নির্দেশ ও হত্যাকাণ্ডের দায় নেওয়ার বক্তব্যের অভিযোগ; চেয়ারম্যানের দাবি, ভিডিও এডিট করা
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামকে সমর্থকদের ‘অস্ত্র বানানোর’ নির্দেশ এবং হত্যাকাণ্ড ঘটলেও দায় নেওয়ার বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বক্তব্যের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন নোটিশটি দেন। এতে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে চেয়ারম্যানকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২১ সেপ্টেম্বর রাতে সালথার উজিরপুর বাজারে নিজ সমর্থকদের উদ্দেশে চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই বক্তব্যের ১০ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘অস্ত্র বানান, মার্ডার হলে আমি দেখব।’ একই বক্তব্যের আরেক অংশে নেতৃত্বের অধীনে কোনো ঘটনা ঘটলে ‘দুইটা মার্ডার হোক বা পাঁচটা’ হলেও তার দায়ভার নেওয়ার কথা বলতে শোনা যায়।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর আরও একটি অংশে চেয়ারম্যানকে সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ ও প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাতে শোনা যায়। সেখানে স্থানীয় কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে নির্দিষ্ট সময় প্রতিরোধ করার এবং প্রয়োজন হলে আশপাশের এলাকা থেকে লোকজন পাঠানোর কথাও বলতে শোনা যায়। তবে ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, বক্তব্যের আগে-পরে কী বলা হয়েছিল এবং ভিডিওতে কোনো সম্পাদনা হয়েছে কি না—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন চেয়ারম্যানের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে শোকজ নোটিশ দেয়।
শোকজ নোটিশে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে যদুনন্দী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামকে ‘অস্ত্র বানান, মার্ডার হলে আমি দেখব’ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। এতে এলাকায় চাঞ্চল্য ও জনরোষের সৃষ্টি হয়েছে। নোটিশে এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৪(৪)(খ) ধারার আওতায় ইউনিয়ন পরিষদ বা রাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হানিকর কার্যকলাপ, অসদাচরণ বা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন বলেন, চেয়ারম্যানের ভাইরাল বক্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়ে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হলে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হতে পারে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি এডিট করা এবং সেখানে বক্তব্য যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তিনি সেভাবে কথা বলেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সভাটি ছিল মূলত স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এবং তিনি বিরোধ মিটিয়ে এলাকার মানুষকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
চেয়ারম্যান আরও দাবি করেন, স্থানীয় একটি বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তাঁর সমর্থিত এক ভ্যানচালককে প্রতিপক্ষের লোকজন মারধর করে ভ্যান রেখে দিয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্য, চাইলে দলীয় লোকজন নিয়ে ভ্যানটি উদ্ধার করতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা না করে পুলিশের সহায়তা নিচ্ছেন। এলাকায় শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সালথার যদুনন্দী ইউনিয়ন এবং পাশের বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ময়েনদিয়া বাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের বিরোধ রয়েছে। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে অতীতেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে ভাইরাল ভিডিওর বক্তব্যের সঙ্গে ওই বিরোধের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।
চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবলুর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। চেয়ারম্যান সম্প্রতি এ ধরনের কোনো বক্তব্য দিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
প্রশাসনের দেওয়া শোকজ নোটিশের পর এখন চেয়ারম্যানের লিখিত জবাবের দিকে নজর রয়েছে। তিনি ভিডিওটি সম্পাদিত বলে যে দাবি করেছেন, সেটির পক্ষে কোনো কারিগরি বা অন্য কোনো প্রমাণ তিনি প্রশাসনের কাছে দেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভিডিওটির মূল উৎস, পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড এবং বক্তব্যের ধারাবাহিকতা যাচাই করা হলে অভিযোগটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট আরও স্পষ্ট হতে পারে।
এদিকে ইউএনওর বক্তব্য অনুযায়ী, শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হলে বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। ফলে ভিডিওতে শোনা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি চেয়ারম্যানের প্রশাসনিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে এখন পর্যন্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি। শোকজের জবাব এবং প্রশাসনিক যাচাইয়ের পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।