খুলনার রূপসায় ছেলে জয় ঢালীকে হত্যার দেড় মাসের মাথায় গুলি করে হত্যা করা হলো তাঁর বাবা আক্তার ঢালীকে। সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে বাড়ির সামনে বসে থাকা অবস্থায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন তিনি। এর আগে গত ১৫ আগস্ট একই এলাকায় জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল। দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো মাগরিবের নামাজের পর আক্তার ঢালী স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বাড়ির পাশে একটি বেঞ্চে বসে ছিলেন। এ সময় কয়েকটি মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে আসে। এরপর তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তারা। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় লোকজন আক্তার ঢালীকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার জাহিদ বলেন, দুর্বৃত্তদের গুলিতে আক্তার ঢালী নিহত হয়েছেন। কী কারণে এবং কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
নিহত আক্তার ঢালী স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে আইচগাতি ইউনিয়নের বিএনপির সাবেক সদস্য এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ কোনো বক্তব্য দেয়নি।
আক্তার ঢালীর পরিবারের ওপর এর আগে নেমে এসেছিল আরও বড় আঘাত। গত ১৫ আগস্ট রাতে দুর্জনীমহল গ্রামের শহীদের মোড় এলাকায় তাঁর ছেলে জয় ঢালীকে (২৭) হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয়কে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল।
জয় হত্যার ঘটনায় তাঁর মা নাসিমা বেগম বাদী হয়ে ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছিলেন। আবার কিছু প্রতিবেদনে আক্তার ঢালীকে ওই মামলার বাদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মামলার বাদী কে ছিলেন, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। তবে পুলিশ নিশ্চিত করেছে, জয় ঢালীর হত্যার পর তাঁর বাবা আক্তার ঢালীও এবার হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
দেড় মাসের ব্যবধানে একই পরিবারের বাবা ও ছেলেকে হত্যার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, আগের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নতুন হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না। পুলিশও বিষয়টি তদন্তের অংশ হিসেবে দেখছে। তবে এখন পর্যন্ত হত্যার উদ্দেশ্য বা দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্রের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
ঘটনার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। হত্যাকাণ্ডের আলামত সংগ্রহসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা জেলায় ৩৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যাকাণ্ড গুলিতে হয়েছে। রূপসা উপজেলায় চলতি বছর এ নিয়ে ১২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
এদিকে খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানিয়েছেন, আক্তার ঢালী হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের কাছে বিভিন্ন তথ্য আসছে। সেগুলো যাচাই-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।
তবে বাবা-ছেলের দুই হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। আক্তার ঢালী কেন হামলার লক্ষ্য হলেন এবং ১৫ আগস্টের জয় ঢালী হত্যার সঙ্গে সোমবারের হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—তদন্তে এখন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।