ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কি বৈধ?

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
তেহরানের একটি পুলিশ স্টেশনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসযজ্ঞ- ছবি: রয়টার্স ছবি:
তেহরানের একটি পুলিশ স্টেশনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসযজ্ঞ- ছবি: রয়টার্স ছবি:

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানে এক হাজারের বেশি নিশানায় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।

হামলার বৈধতা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে। কানাডা এরই মধ্যে হামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছে,বর্তমান সংঘাতের সূচনা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই প্রাথমিকভাবে মনে করছে তারা।

সমালোচকদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন এবং এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিচে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আইনি দিকগুলো তুলে ধরা হল-

ট্রাম্প কী বলেছেন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। তার দাবি, ইরান আগে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র, বিদেশে তাদের সামরিক ঘাঁটি এবং মিত্রদের জন্য সেই আসন্ন হুমকি ঠেকাতেই তিনি ইরানে হামলা চালিয়েছেন।

তবে এই দাবির পক্ষে তিনি বিস্তারিত কোনও তথ্য দেননি। কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনও তার বক্তব্যের সপক্ষে যায়নি। ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, ইরান এক মাসের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে। কিন্তু একথার পক্ষে তিনি কোনও প্রমাণ দেননি।

আবার এর আগে গত জুনে ট্রাম্পই বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ করে দিয়েছে। সুতরাং তার বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে আগের দাবির অসঙ্গতি লক্ষ্যণীয়।

প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা কতটুকু
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে হামলা চালিয়ে ট্রাম্প তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা পেরিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং তিনি পররাষ্ট্র সম্পর্ক পরিচালনা করেন।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের আছে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট- উভয় দলের প্রেসিডেন্টই জাতীয় স্বার্থের কথা বলে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই সীমিত পরিসরে সামরিক হামলা চালিয়েছেন। সেই হামলা সময় ও পরিসরের দিক থেকে পূর্ণ যুদ্ধের মতো ছিল না।

কিন্তু ট্রাম্প যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই সীমাকে হয়ত পরীক্ষায় ফেলবেন। ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দুজনই এই অভিযানকে ‘যুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেছেন।হেগসেথ এ যুদ্ধকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী, জটিল এবং নিখুঁত আকাশ অভিযান’ বলেও অভিহিত করেছেন।

ওদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, এই অভিযান পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় চলতে পারে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সেনা হতাহতের সম্ভাবনা আছে।

এর আগে বড় সামরিক অভিযানগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস অনুমোদন দিয়েছিল। যেমন: সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় ২০০১ সালে আফগানিস্তানে এবং ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সময়।

‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ কী
১৯৭৩ সালে পাস হওয়া ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ (ডব্লিউপিআর) প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতার রাশ টেনে ধরতে কাজ করে। এই আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট কেবল তখনই সেনাবাহিনীকে সশস্ত্র সংঘাতে জড়াতে পারেন যদি কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা করে কিংবা এর জন্য নির্দিষ্ট কোনও এখতিয়ার দেয়।

তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড কিংবা সেনাবাহিনীর ওপর হামলা হলে এর জবাবে এমন পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টকে নিয়মিত কংগ্রেসকে সামরিক অভিযানের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হয়। ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার থেকে ইরানে হামলা বিষয়ে কংগ্রেসকে অবহিত করতে শুরু করেছে।

তাছাড়া, ওয়ার পাওয়ারস আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া শুরু হওয়া কোনও সামরিক অভিযান ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হয়, যদি না কংগ্রেস সেই সময়সীমা বাড়ায়।

এই আইনে কংগ্রেস চাইলে প্রস্তাব এনে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করতে পারে। উভয় দলের আইনপ্রণেতারা এমন একটি প্রস্তাব এ সপ্তাহে ভোটে তোলার পরিকল্পনার কথা বলেছেন।

তবে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতার কারণে এমন প্রস্তাব পাসের জন্য কংগ্রেসে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হতে পারে।

অনেক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, শেষ পর্যন্ত জনমতই ট্রাম্পের এই অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার রাশ টেনে ধরতে প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতিসংঘ সনদের আওতায় অনেক দেশই ইরানে হামলাকে অন্যায় হিসাবেই গণ্য করবে। কারণ, জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, এক সদস্য দেশ অন্য দেশগুলোর ওপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না কিংবা শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিতে পারে না।

এর কেবল দুটি ব্যতিক্রম আছে- যদি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অনুমতি দেয় অথবা যদি দেশটি আত্মরক্ষার জন্য হামলা করে। ইরানে হামলার ক্ষেত্রে কোনোটিই খাটছে না।

তবে আন্তর্জাতিক আইনে সম্ভাব্য হামলার আগেই আত্মরক্ষামূলক হামলার (প্রি-এম্পটিভ সেলফ ডিফেন্স) একটি ধারণা রয়েছে।

সেটি হল: যদি কোনও দেশ প্রমাণ করতে পারে যে, তার ওপর আসন্ন ও ভয়াবহ হামলা হতে চলেছে, তাহলে সেই হামলা ঠেকাতে আগাম সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার যুক্তি দাঁড় করানো যেতে পারে।

এদিক থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বৈধ হত, যদি তারা প্রমাণ দিতে পারত যে তাদের ওপর ভয়াবহ হামলা আসন্ন।

অন্যদিকে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা থাকায় তারা অনেকটাই সুরক্ষিত। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করলে এখনও এর মূল্য দিতে হতে পারে।

এই সংঘাতের যথেষ্ট ন্যায্যতা নেই উল্লেখ করে যুক্তরাজ্য ও স্পেন তাদের সামরিক ঘাঁটি সীমিত পরিসরে ব্যবহার করতে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।

খামেনিকে হত্যা করা কি বৈধ
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যা বৈধ কিনা সেটি স্পষ্ট নয় বলেই মত আইনি বিশেষজ্ঞদের।

কারণ, কয়েকটি খবরে যে তথ্য উঠে এসেছে তাতে বলা হচ্ছে যে, খামেনির ওপর আসলে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। আর যুক্তরাষ্ট্র খামেনি সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য এবং আভিযানিক সহায়তা দিয়েছে ইসরায়েলকে।

১৯৮১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান একটি নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কর্মকর্তা বা তাদের হয়ে কাজ করা কাউকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হওয়া থেকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। এই আদেশ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও রাষ্ট্র নেতাকে হত্যা করা শান্তিপূর্ণ সময়ে ‘অ্যাসাসিনেশন’ বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য হতে পারে, আবার সেই হত্যাকাণ্ডই সশস্ত্র সংঘাতের সময় যুদ্ধের বৈধ সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

খামেনির ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের বৈধতার বিষয়টি নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের ওপর- এক. খামেনি নিহত হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল কিনা। দুই. খামেনিকে সামরিক নেতা হিসেবে বৈধ নিশানা বলে ধরা যায় কিনা সেটি।

সূত্র : বিডিনিউজ

এলাকার খবর

সম্পর্কিত